ইসি গঠনের নতুন আইন স্বৈরাচারীদের হাতিয়ার হবে

মোহাম্মদ শাহ আলম

২৯-৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এর কথিত নির্বাচনের পর নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা বলেও আর কিছু নেই। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শাসক দলের ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছে তা এক সীমাহীন কলংকের নজির তৈরি করেছে। সরকার, সরকারি দল ও নির্বাচন কমিশন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ গোপন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। নির্বাচনকে পুরোপুরি হাস্যকর, অর্থহীন, অকার্যকরি এক মহা তামাশায় পরিণত করা হয়েছে।

গত ৫০ বছরে শাসকশ্রেণি নির্বাচন কমিশন আইন করতে পারেনি। এই পর্যায়ে এসে সরকার নির্বাচন কমিশন গঠনের খসড়া আইন সংসদে তুললেও বর্তমান সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, সংসদে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, ফলে সংসদ ভারসাম্যহীন। এই আইনের খসড়া পড়ে মনে হয়েছে, এটি নির্বাচন কমিশন গঠন আইন নয়, বরং সার্চ কমিটি গঠনের খসড়া, আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সিইসি ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতি ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন, রাষ্ট্রপতি আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে মতবিনিময় করে প্রত্যক্ষভাবে সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। এখন আইন করে তাকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। তাই রাষ্ট্রপতির আগের উদ্যোগের সঙ্গে এই আইনের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও সীমিত। নির্বাহী বিভাগ ও দলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনে গণতন্ত্র বন্দী। দলের মধ্যে গণতন্ত্র নাই, তাই সংসদেও বহু বছর ধরে গণতন্ত্রের প্রতিফলন নাই। বড় দুই দলের মধ্যে গণতন্ত্র উত্তরাধিকারের রাজনীতির ফাঁদে পড়ে গেছে। পড়ে গেছে সামরিক-বেসামরিক লুটেরা ব্যবসায়ীদের শ্রেণিস্বার্থের ফাঁদে।

যেই পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করার আইন করা হচ্ছে তাতে স্বৈরশাসক বিশেষ করে সামরিক স্বৈরশাসকদের পোয়াবারো হবে এবং তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। তারা যে শ্রণি স্বার্থের রক্ষক সেই শ্রেণিস্বার্থ রক্ষিত হবে। যে গণবিরোধী আর্থ সামাজিক নীতিতে চলছে তাকে স্থিতি দেয়ার জন্য এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ভোট ও গণতন্ত্রের ওপর জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা হারিয়ে যাবে। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য এটি অশনী সংকেত। তাই তৃণমূল থেকে গণতন্ত্রের লড়াই জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।

মানুষের ভোটাধিকার, গণতন্ত্রহীনতার মূল কারণের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দিই তাহলে দেখা যায় গণবিরোধী শাসকশ্রেণি তার জন্য দায়ী। বহু শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ স্বৈরাচারের পতনের পর, গণআন্দোলনের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া তিন জোটের রূপ রেখার ঘোষণা ও ধারণা অনুযায়ী এক মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের অধীনে মাগুরার উপনির্বাচনে আবার যে ভোট কারচুপির নির্বাচন হয়, তার পটভূমিতে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। যাতে আওয়ামী লীগ জামাতকে আন্দোলনের কৌশলগত মিত্র হিসাবে বেছে নেয়। এই সময় ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে বিএনপি কিছু ছোট-খাট দল নিয়ে প্রহসনের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে। ঐ ভোটার বিহীন সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ হয়। এবং ১৯৯৬ সালের ১২ জুনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে, ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসে। এরপর আরও দুইটি নির্বাচন তত্ত্ববায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনগুলোতে জনগণ নিজের ভোট নিজে প্রয়োগ করতে পারে। আওয়ামী লীগ ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংসদে বাতিল করে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিশেষ করে সামরিক শাসনের আমলে ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’ দাবিতে সংগ্রাম করে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের মধ্য দিয়ে মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ জাতির সামনে এসেছিল। কিন্তু ১৯৯০ এর পরবর্তী লুটেরা শ্রেণির শ্রেণিস্বার্থ,  ক্ষমতাসীন দলগুলোর ক্ষমতা লিপ্সার কারণে বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতেই পারেনি। স্বৈরাচার আমলের মতো নির্বাচন পুনরায় তামাশায় পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান আমলেও মানুষ সার্বজনীন ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করেছে। গণতন্ত্র ও স্বায়ত্বশাসনের জন্য লড়াই করতে গিয়ে, শেষ পর্যন্ত অস্ত্র ধরে দেশ স্বাধীন করতে হয়েছে।

মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র কেন বার বার নির্বাসনে যাচ্ছে? কেন এমন হচ্ছে? এটা গভীরভাবে বিচার করা প্রয়োজন। মূলত সম্রাজ্যবাদ নির্ভর শাসক শ্রেণির আর্থসামাজিক নীতি ও শ্রেণি স্বার্থ গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ গণতন্ত্র থাকলে, জবাবদিহিতা থাকলে তাদের আর্থসামাজিক নীতি দর্শন বাস্তবায়িত করা কঠিন। পাকিস্তান আমল থেকে এই অভিজ্ঞতা জনগণের হয়েছে। বর্তমান সরকার বলছে- উন্নয়ন চান না গণতন্ত্র চান। পাকিস্তান আমলে স্বৈরাচার আয়ুব খানও বলেছিল ‘উন্নয়ন চান না গণতন্ত্র চান’? আয়ুব বিদেশি প্রভূদের সহযোগিতায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট বাতিল করে গণতন্ত্র বিরোধী অভিনব মৌলিক গণতন্ত্র চালু করে। আজ আমাদের দেশেও ভোটবিহীন গণতন্ত্র ও সংসদ দেখছি। অতীতের সরকারগুলোও গণবিরোধী আর্থসামাজিক নীতির কারণে একই কাজ করেছে। তাই দেশের সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা শাসক শ্রেণির শাসন অব্যাহত রেখে গণতন্ত্র রক্ষা, গণতন্ত্র আনা সম্ভব নয়। পাকিস্তান আমল থেকে এই অভিজ্ঞতা এদেশের জনগণের রয়েছে।

নির্বাচনের সময় দলীয় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকলে কোনো নির্বাচন কমিশনের পক্ষে স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। নির্বাচনের সময় সকল ধরনের নির্বাহী ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের আওতায় আনার বিধান করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনকে করতে হবে স্বাধীন ও সার্বভৌম। শাসকশ্রেণির ক্ষমতার খেলার নির্বাচন কমিশন নয়। জনগণের অবাধ ভোটাধিকার রক্ষার ও প্রয়োগ করার নির্বাচন কমিশনই জনগণ চায়। গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকারকে রাহুমুক্ত করতে হলে তৃণমূল থেকে জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.