ইরানের হিজাববিরোধী আন্দোলনকে কীভাবে পাঠ করবো?

কাবেরী গায়েন

‘জিন-জিয়ান-আজাদী

‘জিন-জিয়ান-আজাদী’ বা ‘নারী-জীবন-মুক্তি’র স্লোগানে আক্ষরিক অর্থেই আগুন জ্বলছে ইরানের রাজধানী তেহরানে গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে, ছড়িয়ে পড়ছে দেশব্যাপী। সেই আগুনে হাজার হাজার নারী পুড়িয়ে ফেলছেন তাদের হিজাব- ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পরে জারি হওয়া বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের কারণে যা ছিলো তাদের জন্য অবশ্যপালনীয় পোশাক। এই হিজাব পোড়ানোর তাৎক্ষণিক কারণ হলো হিজাবের ফাঁক দিয়ে চুল দেখা যাওয়ার অপরাধে নীতিপুলিশি হেফাজতে ২২ বছরের কুর্দিস্থানি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যু।

তবে এই আন্দোলন আজ আর কেবল নারীদের হিজাব পোড়ানোতে থেমে নেই। অন্তত পঁচাত্তর জনের বেশি আন্দোলনকারী জীবন দেয়ার পরে এই আন্দোলন হয়ে উঠেছে ইরানি জনগণের ইসলামি শাসনতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সেই আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। হিজাববিরোধী নারীবাদী আন্দোলন কীভাবে আজকের তরুণদের আজাদীর আন্দোলন হয়ে উঠেছে, যা ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আন্দোলনের গণজোয়ার তৈরি করেছে সেটি পাঠ করা এবং নিজেদের করণীয় নির্ধারণের জন্য রাজনৈতিক ডিসকোর্সের ভেতর নিয়ে আসা জরুরি।

পশ্চিমা গণমাধ্যম, টুইটার, ফেসবুক এবং ইউটিউবে পাওয়া ফুটেজ থেকে পাওয়া ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ থেকে পরিষ্কার তিনটি ভাগে এই আন্দোলনকে দেখা যেতে পারে।

১.

মাহসা আমিনির মৃত্যু এবং হিজাববিরোধী আন্দোলন

হিজাব আইন লংঙ্ঘনের অভিযোগে বা সোজা কথায় বললে যথাযথভাবে হিজাব না পরার কারণে ইরানি পুলিশ পশ্চিম ইরান থেকে তেহরানে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে আসা মাহসা আমিনিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। আর পুলিশি হেফাজতেই ১৬ সেপ্টেম্বর মারা যান এ নারী। হিজাবের ফাঁক দিয়ে চুল দেখা যাওয়ার অভিযোগে শুরু থেকেই মাহসাকে পিটিয়েছে পুলিশ, তার ভাইয়ের সামনেই তাকে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয় ‘শিক্ষা ও পরামর্শ’ কেন্দ্রে। সেখান থেকে কয়েক ঘণ্টা পরে প্রথমে তার অজ্ঞান হওয়ার খবর পাওয়া যায় এবং ধরে নিয়ে যাবার তিন দিন পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে তেহরানে আর লাখো নারী বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। নেমে আসেন তারা রাস্তায়। তেহরানের পথে পথে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনে হিজাব ছুঁড়ে ফেলা নয় শুধু, যে চুল দেখা যাবার অপরাধে মাহসার জীবন দিতে হয়েছে, নারীরা নিজেদের সেই চুল কেটে পতাকা বানিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন তেহরানের পথে পথে। এমনকি যে শরীরের আভাস দেখা যেনো না যায় সে কারণে ঢোলা জামা পরা বাধ্যতামূলক, সেই শরীর থেকে নারীরা নিজেদের জামা খুলে নিয়ে প্রতিবাদের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। পথনাটকের মধ্য দিয়ে তুলে ধরছেন হিজাব আইন অমান্য করলে কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হন তারা, তার নান্দনিক প্রকাশ।

এ পর্যন্ত, হিজাববিরোধী বিক্ষোভে অন্তত ৭৫ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন নিরাপত্তা পুলিশের গুলিতে। কিন্তু কোন অত্যাচারের ভয়েই যেনো ভীত নন আর নারীরা। প্রতিবাদী নারীর সংখ্যা প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। এমনকি সত্তরোর্ধ নারীও নেমে এসেছেন রাস্তায় মাথার হিজাব হাতে ধরে, পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জীবন মুক্ত করার প্রতিজ্ঞায়।

প্ল্যাকার্ডে, পোস্টারে, টুইটারে নারীরা লিখছেন, ‘No to mandatory Hijab (বাধ্যতামূলক হিজাবকে না)’, ‘Hijab is violence against Women’ (হিজাব নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা), Women, life, freedom (নারী, জীবন, মুক্তি), ‘They kill us in your silence’ (তারা আমাদের হত্যা করে আপনাদের নীরবতায়), ‘Don’t pray/We don’t need your prayers/Fuck your prayers/Do Something!’ (প্রার্থনা করবেন না/আপনার প্রার্থনা আমাদের দরকার না/প্রার্থনা বাদ দিন/ আমাদের জন্য কিছু করুন)।

হিজাবকে না বলার এই আন্দোলনের ভাষা মাঝে মাঝে কঠোর হয়ে উঠছে। যেমন বলা হচ্ছে, ‘We will kill anyone who has killed our sister’ (আমাদের বোনকে যে হত্যা করেছে, আমরা তাদের হত্যা করব)। হিজাববিরোধিতা থেকে এই আন্দোলন ইসলামি শাসনতন্ত্র পতনের ডাক দিয়েছে, ‘Death to dictator’ এমনকি আলী খামেনির মৃত্যুও দাবি করছে, ‘Death to Khameine (খামেনির মৃত্যু চাই)’। প্ল্যাকার্ডে লিখে পৃথিবীর মানুষদের জানিয়েছেন তারা, ‘Did you know that letting your hair blow in the wind is a crime in Iran?’ (আপনি কি জানেন আপনার চুল বাতাসে ওড়া অপরাধ ইরানে?)।

আর সব ছাপিয়ে উঠেছে ইরানি শিল্পী বাহাদুর হাদিজাদের করা এক অ্যানিমেশন যেখানে তেহরানের আইকনিক আজাদী টাওয়ারের উপর বাতাসে উড়ন্ত কালো চুল মেলে দেয়া হয়েছে ইরানি নারীদের সাহসী সংগ্রামের সাথে সংহতি জানিয়ে। পৃথিবীর সকল সংগ্রামী শিল্পীসত্তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে এই অ্যানিমেশন।

 ২.

হিজাববিরোধী আন্দোলন এবং এনঘেলাব স্ট্রিটের মেয়েরা

বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে ইরানী নারীদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আজকের নয়। অনেক বড় বড় বিক্ষোভ-সমাবেশ এর আগেও সংঘটিত করেছেন ইরানি নারীরা দেশে এবং প্রবাসে। ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লা রুহুল্লা খোমেনি ১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ ঘোষনা দেন যে নারীরা অবশ্যই ইসলামি পোশাক রীতি মান্য করবে। খোমিনি ইসলামি বলেছিলেন, শাহবিরোধী আন্দোলনে নারীরা হিজাব পরে অংশ নিয়েছেন। এই হিজাব তাই নতুন বিপ্লবের প্রতীক যা নারীরা বহন করবেন।

পরদিন ছিলো ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সেদিন তেহরানের রাস্তায় লাখো নারী বিক্ষোভ করেন, এটিই ছিলো প্রথম হিজাববিরোধী বিক্ষোভ। সেদিন তাদের স্লোগান ছিলো, “In the dawn of freedom, there is an absence of freedom”।

সেই বিক্ষোভের মুখে, সরকার থেকে বলা হয় এটা তাদের পরামর্শ মাত্র, আইন নয়। তবে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আয়াতুল্লা খোমেনি ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েম করার জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবার পরে ১৯৮০ সালে সরকারি অফিস-আদালতে এবং ১৯৮৩ সাল নাগাদ সকল নারীর জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। এই আইনের আওতায় অফিস-আদালত-সামাজিক যে কোনো পরিসরে হিজাববিহীন উপস্থিতির জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়, কোন সার্ভিস প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়।

২০০৯ সালে নারীরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে হিজাববিরোধিতার ডাক দিয়েছেন। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ২০১৪ সালে করা এক জরিপের বরাতে জানান যে, শতকরা ৪৯.৮ শতাংশ ইরানি জনগণ বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরোধী। এসময় অনেকেই ধারণা করছিলেন যে, ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা কঠোর ইসলামিক আইনি ব্যবস্থায় খানিকটা পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। ২০২০ সালের এক জরিপে দেখা যায় ৫৮ শতাংশ জনগণ একেবারেই হিজাব সমর্থন করেন না এবং ৭২ শতাংশ জনগণ বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের বিরোধী।

কিন্তু পরিবর্তনের সুবাতাস ইরানের নারীরা পাননি। ইরান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে অমুসলিমদেরও হিজাব পরা বাধ্যতামূলক। ২০১৮ সালে একজন চাইনিজ নারী সংগীতজ্ঞকে তার কনসার্ট পরিবেশনের মাঝপথে জোর করে হিজাব পরিয়ে দেয়া হয়েছিলো।

ইরানের নারীরা আজ যখন নিজেদের চুল কেটে পতাকা উড়াচ্ছেন, তখন তারা মনে করছেন ভয়েস অফ আমেরিকা পারসিয়ান টেলিভিশনের উপস্থাপক মসিহ আলিনেজাদের কথা, যিনি ‘হোয়াইট ওয়েনেস ডে’ নামের একটি প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করেছিলেন ২০১৭ সালে। তার পথ অনুসরণ করে নারীরা তাদের হিজাববিহীন প্রতিবাদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকেন। মনে করেছেন তারাভিদা মোভাহেদ-এর কথা। তিনি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তেহরানের এনঘেলাব স্ট্রিটে (স্বাধীনতা সড়ক) দাঁড়িয়ে তার হিজাবকে একটা লাঠির আগায় বেধে জনগণের উদ্দেশ্যে পতাকার মত দুলিয়েছেন। সেদিনই তিনি গ্রেফতার হন এবং একমাস পরে ছাড়া পান।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অনেক নারী যথাযথ নিয়মে বোরকা বা হিজাব না পরার জন্য এবং বোরকা-বিরোধী প্রতিবাদের জন্য গ্রেফতার হয়েছেন। নারগেস হোসেইনি, নাসরিন সোটুদেহ, আজম জানগ্রাভি, শাপারক শাজারিজাদে, মারিয়াম শারিয়াত মাদারি, হামরাজ সাদেঘি কিংবা মাদেহ হোজাবরিসহ অসংখ্য নারীর হিজাববিরোধী প্রতিবাদ, তাদের ওপর নেমে আসা নির্যাতন এবং গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন নিরবচ্ছিন্ন থেকেছে। সবশেষ শিকার মাহসা আমিনি।

বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে ইরানের বাইরে থেকেও অনেক প্রতিবাদ সংঘটিত হয়েছে। ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সামাজিক মাধ্যমে hashtag #NoHijabDay-. ডাক দেয়া হলে সারা পৃথিবীর ইরানি নারীরা নিজেদের হিজাব পুড়িয়ে স্বদেশের মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেয়া বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরোধিতা করেন। বিষয়টি কেবল হিজাবের নয়, নারীর পোষাক পরার স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ হিসেবে যেমন দেখেছেন তারা, একই সাথে এইসব প্রতিরোধ প্রায়শই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে ২০০৯ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা, যেখানে বাধ্যতামূলক হিজাব পরার বিষয়টি উল্লেখ করার কারণে অনেক নারী গ্রেফতার হয়েছেন, অনেকেই দেশ ছেড়েছেন।

 ৩.

হিজাববিরোধী আন্দোলন থেকে ইসলামি শাসনতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন

১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই আন্দোলন মূলত নারীদের পোশাক ও চলাফেরার স্বাধীনতার সাথে সম্পর্কিত হলেও আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ইরানি পুলিশ শুধু নয়, সেনাবাহিনীও আন্দোলনকারীদের গুলি এবং জলকামান নিয়ে আক্রমণের তীব্রতা বাড়িয়ে দেবার ছয় থেকে সাত দিনের মাথায় নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও নেমে এসেছেন রাস্তায়। স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে আলী খামেনির শাসনব্যবস্থা পতনের। খোমেনির ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিবিসির সবশেষ খবর অনুযায়ী জনগণ এখন রাস্তায়, ইসলামি শাসনতন্ত্রের ক্ষমতা থেকে মুক্ত হতে চাইছেন। পুলিশ জনপরিসরে আসতে ভয় পাচ্ছে।

অতীতের আন্দোলনগুলোর সাথে এবারের আন্দোলনের গুণগত পার্থক্য রয়েছে। এটি প্রথমত নারীদের আন্দোলন, পুরুষরা সেখানে সহযোগী হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এটি অপেক্ষাকৃত তরুণদের আন্দোলন যারা তাদের মা-বাবার প্রজন্মকে সরাসরি দায়ী করছেন কেনো তারা যথাযথ লড়াইটি করেননি সময়মত। কাজেই তরুণদের এই সংগ্রামে বাবা-মা কিংবা তাদেও পূর্বসূরিদেও প্রজন্ম সহযোগী শক্তি হিসেবে অংশ নিচ্ছে। তৃতীয়ত, তরুণরা আন্দোলনের একটা ফল পেতে চান, কারণ তারা মনে করছেন এই ধর্মতান্ত্রিক শাসন তাদের কিছু দিতে পারছে না, এই অবস্থার অবসান চান তারা। যুক্ত হয়েছেন দরিদ্র ও প্রান্তিক তরুণরাও।

এই প্রজন্মের কাছে বাধ্যতামূলক হিজাব হচ্ছে এই সরকার ব্যবস্থার জনগণের জীবন ও পরিসর নিয়ন্ত্রণের এক প্রতীক। অথচ ইসলামি বিপ্লবের আগে নারী-পুরুষের অসাম্য তেমন একটা ছিলো না। ব্যক্তিগত পরিসরে আক্রমণকারী সরকার শুধু নয়, এই ব্যবস্থারই অবসান চান তারা।

ইতোমধ্যে সারা দেশের ৮৫টি শহরে ছোট ছোট পকেটে এই আন্দোলন জারি রয়েছে। রাস্তায় লাখো মানুষ একসাথে দেখা যাচ্ছে না হয়তো, কিন্তু প্রতিদিন দেশের নানা জায়গায় মানুষ জড়ো হয়ে প্রতিবাদ করছেন। এমনকি যেসব ছোট ছোট শহরকে ইসলামি শাসনতন্ত্রের ঘাঁটি হিসেবে মনে করা হত, সেসব জায়গায়ও প্রতিবাদ হচ্ছে।

আন্দোলনটি ক্রমশ একটি আন্তর্জাতিক রূপ পাচ্ছে। সিরিয়ার নারীরা বিশাল বিক্ষোভ করেছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারীরা সেসব দেশে অবস্থানরত ইরানি নারীদের সাথে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন। জার্মানি, নরওয়ে, স্পেন ইতোমধ্যে ইরানের ওপর তাদের অর্থনৈতিক সংরক্ষণ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে, যদি না প্রতিবাদকারীদের উপর অত্যাচার থামানো হয় ইরানে।

উল্লেখ্য, ১৯২৬ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইরানের নারীদের জাগরণের কাল। ১৯৩৬ সালের ৮ জানুয়ারি রেজা শাহ পাহলভি ডিক্রি জারি করে অফিস আদালতে নারীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করেছিলেন। নারীরা কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিক পরিসরে দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। কিন্তু, ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েমের পরে বাধ্যতামূলক হিজাব নয় শুধু, পদস্থ চাকরি থেকে নারীদের সরিয়ে নেয়া, রাস্তায় গাড়ি চালাতে না দেয়া, বিচারক হিসেবে নারীদের নিয়োগ বন্ধ করার মত পদক্ষেপ নেয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা খানিকটা তৈরি হলেও ইসলামি পোশাকরীতির ব্যত্যয় হলেই তার উপরে নীতিপুলিশের আক্রমণ, জেল-জুলুম-জরিমানা জারি ছিলো। আদালতে এক পুরুষের বিপরীতে দুই নারীর সাক্ষ্য দেবার রীতিও বহাল।

 ৪.

কীভাবে পাঠ করবো এই জাগরণকে?

বাংলাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে যারা যুক্ত তাদের এই ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে যাবার সুযোগ নেই। ধর্মীয় মৌলবাদের সাথে মোকাবিলার বিষয়টি পুনরায় পাঠ এবং অনুধাবনের প্রসঙ্গটি এখন আরো যৌক্তিক মনযোগের দাবি রাখে।

লিবারাল থিওলজির বিষয়টি ইদানিং আমাদের দেশেও আলোচিত হচ্ছে। লিবারাল থিওলজি, বিশেষ করে ’৭০ এবং ’৮০-র দশকে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বেশ প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলো। নিকারাগুয়া,চিলি,আর্জেন্টিনায় গির্জার পাদ্রিরা যোগ দিয়েছেন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে। সেখান থেকেই লিবারাল থিওলজি আমাদের সব দেশেও আলোচিত হয়েছে।

অমর্ত্য সেন ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ বইতে উন্নয়নের সহযোগী হিসেবে লিবারাল থিওলজির আলোচনা টেনেছেন। কিন্তু পরিণত ইউরোপকেন্দ্রিক বা লাতিন দেশসমূহের লিবারাল থিওলজির সাথে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা এশিয়ার, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে এই তত্ত্বের প্রয়োগ বিষয়ে আলোচনাটি খুব সরাসরি হওয়া দরকার।

ইরানে শাহ বিরোধী আন্দোলনে ইসলামিক রেভোলিউশনারি শক্তিকে সমর্থন দিয়েছিলো ইরানের প্রগতিশীল শিবির,ইরাকের দুই কমিউনিস্ট পার্টি- মুজাহেদিন খালক এবং তুদেহ পার্টি। বিশেষ করে সোভিয়েতপন্থি তুদেহ পার্টি খোমিনিকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছে শুধু নয়, তুদেহ পার্টি ইরানকে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণার পরেও কোয়ালিশন সরকারে ছিলো। বাম প্রগতিশীল তরুণরা গরীব এলাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে দিনমান খেটেছেন, স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছন। ফলাফল? কিছুদিনের মধ্যে তুদেহ পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়, হাজার হাজার বামপন্থি নেতাকে হত্যা করা হয়, তুদেহ পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দিয়েই বলানো হয় যে তারা ষড়যন্ত্রকারী এবং সেইসব বয়ান ভিডিওতে রেকর্ড করে রাখা হয়। একের পর এক শিরচ্ছেদ কার্যকর করা হতে থাকে। ইতিহাস বলে ইসলামি বিপ্লবের পরে অন্তত ৩০ হাজার কমিউনিস্ট কর্মীকে হত্যা করা হয় ইরানে।

ইরানে জন্ম নেয়া এবং শৈশব-কৈশোর কাটানো প্যারিসভিত্তিক বিখ্যাত লেখক এবং চলচ্চিত্রকার মারজান সত্রাপি তখন একজন কিশোরী মেয়ে। তার চাচা ছিলেন তুদেহ পার্টির নেতা, যাকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কীভাবে তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হয়, নারীদের পরিসর কীভাবে সংকুচিত হতে থাকে, গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ হয়, একে একে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেয়া হয় এবং এক সময় কীভাবে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান প্যারিসে এসবের দীর্ঘ বর্ণনা পাওয়া যাবে তাঁর আঁকা ছবিতে, তাঁর ‘পার্সেপোলিস’ বইটিতে।

বইটির চলচ্চিত্ররুপ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে এবং তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে ২০১৭ সালে ডার্টমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ভিজিটিং ফেলো হিসেবে অবস্থান করার সময়ে। তিনি এসেছিলেন ওখানে বক্তৃতা করার জন্য। মনে হচ্ছিলো আমারই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে বুঝি মিলে যায়, তবে ইরানের ঘটনা অনেক বেশি বিশ্বাসঘাতকতার এবং তার ব্যাপকতাও অনেক বেশি, এবং সরাসরি।

কাজেই মুজাহেদিন খালক বা তুদেহ পার্টির অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে মিলিয়ে নেবার ব্যাপার আছে আমাদের দেশের বাম-প্রগতিশীল শক্তির, তথাকথিত ‘ধর্মীয় বিপ্লবী শক্তি’র সাথে কতখানি যুক্ত থাকা যায়, সে প্রসঙ্গে।

নারীর জীবন কোনো ধর্মবাদী রাষ্ট্রে নিরাপদ নয়। নারীর জীবন চূড়ান্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে ভোগবাদী পণ্য অবস্থার অধীনে থাকবার ঝুঁকিতে থেকে যায়। আমাদের অবস্থান তাই একই সাথে ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বা ধর্মীয় মৌলবাদ এবং নিউলিবারাল অর্থনীতিবাদের ‘মুনাফাই মোক্ষ’ বা বাজার মৌলবাদ- এই দুইয়েরই বিপক্ষে। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী হতে পারে লিটমাস টেস্ট।

ইরানের নারীরা তাদের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য হাসিমুখে জীবন দিচ্ছেন, এমনকি তারা বলছেন, মৃতের জন্য শোক করার সময় এটি নয়, এখন সময় এই ব্যবস্থাটি পাল্টে ফেলার। আর তাই হিজাববিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত করেছেন ইরানের ওপর জগদ্দলের মত চেপে বসা তথাকথিত ইসলামি বিপ্লবের সরকারকে পতনের ডাক, যুক্ত করতে পেরেছেন তরুণদের এবং সকল প্রজন্মের মানুষকে। এই জাগরণ এবং প্রতিবাদী আন্দোলন সফল হবে কি না, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও ইরানের ধর্মীয় মৌলবাদী শাসনব্যবস্থার বিপরীতে এ এক শক্ত আঘাত। নারীর চোখে বিশ্ব দেখবার এই আন্দোলনে আমার সর্বাঙ্গীন সমর্থন জানানোর পাশাপাশি এই আন্দোলনকে গভীরভাবে পাঠ করার আবেদন রাখছি।

লেখক: সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.