ইউরোপে আবার লকডাউন

শীতের আগেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে ইউরোপে। তার জেরে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে ফের লকডাউন ঘোষণা করল ফ্রান্স।

৩০ অক্টোবর থেকে পুরো নভেম্বর মাস জুড়ে এই লকডাউন কার্যকর থাকবে বলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো ঘোষণা করেন। তিনি জানান ফ্রান্সে দ্বিতীয় দফা করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা নিশ্চিতভাবে প্রথম দফার চেয়ে গুরুতর’ হবে। তাঁর কথায় দৈনিক ৫০,০০০ সংক্রমণ থেকে অন্ততপক্ষে ৪,০০০-এ না নামা অবধি লকডাউন বিধি শিথিল করা সম্ভব নয়।

পাশাপাশি, সরকারের দেওয়া সব ধরনের বিধি নিষেধ মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি। এই লকডাউনে বন্ধ থাকবে রেস্টুরেন্ট এবং বার। চালু থাকবে স্কুল এবং বিভিন্ন কারখানা। তিনি বলেন লকডাউনে শুধুমাত্র চিকিৎসা অথবা জরুরি কাজের জন্য বাড়ি থেকে বের হতে পারবেন মানুষ। ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য নাগরিকদের ফর্ম পূরণ করতে হবে। এই লকডাউনে যে কোনো ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান একেবারে নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ওয়ার্ল্ডোমিটারস-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ লাখ ৩৫ হাজার ১৩২ আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ৭৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানী প্যারিসসহ বড় বড় শহরে রাত্রিকালীন কারফিউ দেয়া হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ৩০ অক্টোবরের আগের ২৪ ঘন্টায় তারা নতুন ৫২ হাজার ১০ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করেছে। সব মিলে ফ্রান্সে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ। এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা ও স্পেনকে অতিক্রম করে পঞ্চম সর্বোচ্চ আক্রান্তের দেশ ফ্রান্স। মন্ত্রণালয় বলেছে, ২৪ ঘন্টায় সেখানে করোনায় মারা গেছেন ১১৬ জন। এর আগের দিন মারা গিয়েছেন ১৩৭ জন। সব মিলে সেখানে মৃতের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৭৬১।

একই সাথে ফের লকডাউনের পথে হাঁটতে চলেছে জার্মানিও। জার্মানিতে ২-৩০ নভেম্বর বার, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খোলা থাকবে স্কুল। দোকানপাট খোলা থাকলেও সেখানে কড়া বিধিনিষেধ থাকবে। অন্যদিকে দুই দেশের লকডাউনের ঘোষণার সাথেই ধস নামে আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারে। আর মে মাসের পর ব্রিটেনে ২৭ অক্টোবর একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে তার উপদেষ্টারা সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, কমপক্ষে তিন মাসে প্রতিদিন কয়েক শত করে মানুষ মারা যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটেনে ভয়াবহভাবে দ্বিতীয় দফা করোনা সংক্রমণের বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আরো কঠোর লকডাউন আরোপের চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে বরিস জনসনের ওপর। একদিনে ব্রিটেনে মারা গেছেন ৩৬৭ জন। এদিন আক্রান্ত হয়েছেন কমপক্ষে ২৩ হাজার মানুষ। ফলে ব্রিটেনেও শীঘ্রই আসছে লক ডাউন।

এদিকে ব্রিটিশ এক গবেষণার ফলাফল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ রোধে হার্ড-ইমিউনিটি অর্জনের আশা প্রায় নস্যাৎ করে দিয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, করোনা সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তির দেহে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা সুস্থ হওয়ার পর বেশ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। এ খবর দিয়েছে স্কাই নিউজ। কিন্তু ব্রিটেনের বিখ্যাত ইম্পেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গত গ্রীষ্মে দেশটিতে লকডাউন শিথিল হওয়ার পর থেকে করোনার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডিসম্পন্ন ব্যক্তিদের দেহে অ্যান্টিবডির পরিমাণ ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষকরা গত জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মানুষকে তিন দফা পরীক্ষা শেষে ফলাফল বিশ্লেষণ করে এই অনুসিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন।

রিয়েক্ট-২ শীর্ষক গবেষণাটিতে দেখা গেছে, লকডাউন শিথিলের সময়, গত জুনের শেষ ও জুলাইয়ের শুরুর দিকে পরীক্ষিতদের ৬ শতাংশের মধ্যে অ্যান্টিবডি ছিল। কিন্তু গত মাসে ব্রিটেনে করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ শুরুর সময় অ্যান্টিবডিসম্পন্ন ব্যক্তিদের হার ৪.৪ শতাংশে নেমে আসে। অধ্যাপক হেলেন ওয়ার্ড বলেন, নতুন এ ফলাফল কিন্তু জোরালো প্রমাণ যে, হার্ড-ইমিউনিটি অর্জন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ১০০ থেকে ৯৫ জন মানুষই সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা মানে হলো, আমরা পুরো জনসংখ্যাকে সুরক্ষিত রাখার আশপাশ থেকেও বহু দূরে আছি।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষণাটি জরুরি বিবেচনায় পিয়ার রিভিউ ছাড়াই প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটিতে কেবল অংশগ্রহণকারীদের অ্যান্টিবডির পরিমাণ মাপা হয়েছে। ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতার অপর উৎস টি-সেল নিয়ে কোনো উপাত্ত জানা যায়নি। এমনটা সম্ভব যে, অ্যান্টিবডির পরিমাণ কমলেও টি-সেল সক্রিয় থাকে। তবে এখন অবধি তা নিশ্চিত করার মতো কোনো পরীক্ষা হয়নি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। উৎপত্তিস্থল চীনে ৮৩ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও সেখানে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব কমে গেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ছে।

চীনের বাইরে করোনাভাইরাসের প্রকোপ ১৩ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে গত ১১ মার্চ দুনিয়াজুড়ে মহামারি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আমেরিকার দুই মহাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় সংক্রমণ এখনও দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে ইউরোপকে ল-ভ- করে দিয়ে করোনা কিছুটা স্তিমিত হলেও সেখানে আবারও নতুন করে রোগটির প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এখন আক্রান্তের পর সুস্থ হওয়ার হার দ্রুত বাড়ছে।