ইউক্রেন কি ক্রিমিয়ার পরিণতি ভোগ করবে!

মাহবুব রেজা  

তাহলে যুদ্ধটা কি শুরুই হয়ে গেল ইউরোপে! হ্যাঁ, রাশিয়া- ইউক্রেন সংকটকে সামনে রেখে এরকম আশংকাই করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্বনেতাদের কপালের ভাঁজগুলো দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে আর রাজনীতির সরল অংকের ফলাফল অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছে। তারা পরিস্থিতি যে কোনদিকে গিয়ে স্থির হয় তার ঠাওর করতে পারছেন না। এখন দেখার বিষয় সার্বিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে শেষ হয়। তবে ভূ-রাজনীতিতে ভ্লাদিমির পুতিন কখন যে কোন খেলা খেলেন তা বোঝা যে অত সহজ ব্যাপার নয় তা বিশ্বনেতারা ইতিমধ্যে উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

ভ্লাদিমির পুতিন দিন দিন রাশিয়ার বাইরে নিজের শক্তিমত্তার জানান দিতে স্থির সংকল্পে মেতেছেন। বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিতকেও শক্তিশালী করতে শপথ নিয়েছেন বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। অনেকদিন ধরেই পুতিন খুব ঠাণ্ডা মাথায় এ কাজটা করে আসছিলেন। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে এপর্যন্ত ইউক্রেন সীমান্তে লক্ষাধিক রুশ সৈন্যের সশস্ত্র অবস্থান এবং শক্তির প্রদর্শনী বিশ্ব রাজনীতিতে এক সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট এখন ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাতে রূপ নিতে চলেছে। এ যুদ্ধে ইতিমধ্যে ১৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউক্রেন সীমান্তে পুতিনের এরকম শোডাউনে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো সহ শীর্ষস্থানীয় বিশ্বনেতাদের কপালে ঘাম ছুটে গেছে। তারা পুতিনের এরকম সর্বগ্রাসী মনোভাব আর যুদ্ধংদেহী কর্মকাণ্ডে যারপর নাই বিস্মিত। সঙ্গত কারণে তাই বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে পুতিন কি তাহলে সাত বছর আগে দখল করে নেয়া ক্রিমিয়ার মতো ইউক্রেনও দখল করে নেবে! পুতিন কি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে বিশ্বে নতুন করে আরেকটি অশান্তিময় অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন?

ইউক্রেনও শংকা করছে যেকোনো মুহূর্তে রাশিয়া তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে। শুধু ইউক্রেন কেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা সম্ভাব্য এ অভিযান ঠেকাতে ইউক্রেনে সমরাস্ত্র পাঠাচ্ছে। এছাড়া পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর ঘাঁটিগুলোতে যুদ্ধজাহাজ ও জঙ্গিবিমান পাঠানো হচ্ছে।

রাশিয়া কেন ইউক্রেনের প্রতি এরকম আচরণ করছে?

ইতিহাসবিদেরা বলছেন প্রাচীনকাল থেকে রাশিয়ানরা দাবি করে এসেছে রাশিয়ান আর ইউক্রেনিয়ানদের ইতিহাস, জাতিসত্তা এক সুতোয় গাঁথা। জানা যায়, প্রায় ১২০০ বছর আগে মধ্যযুগীয় পরাশক্তি কিয়েভান রুসে আজকের ইউক্রেন, রাশিয়া ও প্রতিবেশী বেলারুশের আবির্ভাব ঘটে। পূর্ব ইউরোপের বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল কিয়েভান রুস। ওই সব বসতি তৈরি হয়েছিল ইউরোপের চতুর্থ বৃহত্তম নিপার নদীর তীর ঘেঁষে। অন্যদিকে ইউক্রেনের মানুষজন ভিন্ন দাবি করে আসছে। তারা বলছে রাশিয়ান ও ইউক্রেনিয়ানদের মধ্যে ভাষাগত ও ঐতিহাসিক ভিন্নতা ছিল। রাজনৈতিকভাবেও তারা আলাদা ছিল। তবে ইউক্রেনিয়ানদের এ দাবির সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিন একমত নন। পুতিন দাবি করছেন, রাশিয়ান ও ইউক্রেনিয়ানরা একই জনগোষ্ঠী এবং উভয়ই রাশিয়ান সভ্যতার অংশ। পুতিন তার আরেক প্রতিবেশী দেশ বেলারুশকেও রাশিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পক্ষে দাবি জানান। পুতিনের এ দাবিকে সমূলে নাকচ করে আসছেন ইউক্রেনিয়ানরা। তারা বলছেন, পুতিনের এ দাবি তার আগ্রাসী মনোভাব চরিতার্থ করার পূর্ব শর্ত। পুতিনের এরকম বেপরোয়া মানসিকতাই প্রমাণ করে বিশ্ব রাজনীতিতে তিনি নিজেকে অপরিহার্য করে তোলার চেষ্টা করছেন।

পুতিনের ইউক্রেন সীমান্তে আক্রমণ করার মত পরিস্থিতি তৈরির নেপথ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, পুতিন চেয়েছিল ২০০০ সালে চালু হওয়া মস্কো নিয়ন্ত্রিত মুক্তবাণিজ্য জোটে ইউক্রেন যোগ দিক। কিয়েভ এতে অস্বীকার করলে পুতিন ক্ষেপে যায়। একসময় রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার ছিল ইউক্রেন। রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তাদের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। পরে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়। বিশ্ববাজারে ইউক্রেনের প্রধান রপ্তানি পণ্য খাদ্যশস্য ও ইস্পাতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ইউক্রেনের কোম্পানিগুলো ও অভিবাসী শ্রমিকেরা পশ্চিমে নতুন বাজার খুঁজে পেয়েছে।

এছাড়াও পর্যবেক্ষকরা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের এই যুদ্ধ-যুদ্ধ রব তোলার কারণ হিসেবে আরেকটি বিষয়ের দিকে আলোকপাত করার চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন রাশিয়ার সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে করোনার ভ্যাকসিন নেয়ার প্রতি অনীহা রয়েছে। অন্যদিকে ভ্যাকসিন নিতে সরকারের দিক থেকে চাপ রয়েছে। এছাড়া করোনা মহামারির কারণে দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তা কমেছে। হৃত জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে পুতিন ইউক্রেনে আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে মানুষের কাছে নিজের শক্তিমত্তা, জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন এর আগে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ক্রেমলিনের প্রতি মানুষের সমর্থন তুঙ্গে উঠেছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। এখন যদি আবার ইউক্রেন ইস্যুতে যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে পুতিনের পোয়াবারো হবে।

এদিকে ইউক্রেন সীমান্তে পুতিনের লক্ষাধিক সৈন্য, সামরিক সরঞ্জামাদি নিয়ে এরকম যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশ পুতিনের ব্যাপারে নাখোশ। গত বসন্তে (মার্চ-এপ্রিল) ইউক্রেন সীমান্তে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করে এবং জুনে পুতিন প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে এব্যাপারে সরাসরি বৈঠকে বসেন। এছাড়া গত ৭ ডিসেম্বর বাইডেন-পুতিন দুই দুই ঘণ্টাব্যাপী ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন। সেই কনফারেন্সে বাইডেন ইউক্রেন বিষয়ে নমনীয় না হলে রুশ প্রেসিডেন্টকে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ইউরোপে ন্যাটো বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর হুমকি দেন। এরপর থেকে বাইডেন ইউক্রেন ইস্যুতে পুতিনকে একের পর এক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও রুশ প্রেসিডেন্ট বিষয়টিকে যে খুব একটা পাত্তা দিয়েছেন তা বলা যাবে না।

এ মাসের শুরুর দিকে ইউক্রেনের শীর্ষ এক সামরিক বিশেষজ্ঞ সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরাকে জানিয়েছিলেন, রাশিয়া জানুয়ারি মাসের যেকোনো সময়ই ইউক্রেনে অভিযান চালাতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়া ইউক্রেনের এই শংকাকে উড়িয়ে দিয়ে বলছে, আপাতত অভিযান চালানোর পরিকল্পনা তাদের নেই। মস্কো বলছে, তারা চাইলে নিজেদের সীমান্তের যেকোনো জায়গায় সেনা সমাবেশ ঘটাতে পারে এবং তাদের সব পদক্ষেপই আত্মরক্ষামূলক। এদিকে পুতিনসহ দেশটির কর্মকর্তারা ন্যাটোকে পূর্ব দিকে সামরিক উপস্থিতি না বাড়ানোর জন্য সতর্ক করছিলেন।

অনেকদিন ধরেই রাশিয়ার বলয় থেকে কিছু কিছু অঞ্চল বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান করছে। এই অবস্থান কিয়েভ ও পশ্চিমাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে যে ক্রেমলিন তার প্রতিবেশীর সঙ্গে নতুন একটি যুদ্ধ শুরু করতে পারে যারা মস্কোর রাজনৈতিক বলয় থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।

এর আগে ইউক্রেন নিয়ে পুতিনের সাজানো খেলা দেশটির মানুষ মেনে নেয়নি। পুতিন চেয়েছিল ইউক্রেনকে বশে নেয়ার। ২০০৫ ও ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে নিজেদের পন্থীদের উস্কে দিয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে। ফলে ইউক্রেনে দুই দফা গণ অভ্যুত্থান ঘটলেও রাশিয়া পন্থীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। ফলে সেখান থেকে পিছিয়ে আসতে হয়েছিল পুতিনকে। সেই থেকে পুতিন সময়-সুযোগ খুঁজছিল কবে কখন ইউক্রেনকে এক হাত দেখাবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এবার বুঝি পুতিনের সামনে ইউক্রেনকে এক হাত দেখে নেয়ার দিন এসে গেল। এখন দেখার বিষয় ক্রিমিয়ার মতো একই পরিণতি ভোগ করতে হয় কিনা ইউক্রেনকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.