আসুন সমাজতন্ত্রের লড়াইকে অগ্রসর করি

দ্বাদশ কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে মোহাম্মদ শাহ আলমের ভাষণ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাদশ কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে আপনাদের স্বাগত। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ, অভিনন্দন ও লাল সালাম।

পার্টি-কংগ্রেসের এই মঞ্চ থেকে বিপ্লবী অভিবাদন জানাচ্ছি এ দেশের শ্রমিক, কৃষক, ক্ষেতমজুর, খেটেখাওয়া মেহনতি মানুষসহ আপামর দেশবাসীকে, যাঁদের শ্রম-ঘাম, প্রতিভা-সাধনায় সমাজ ও অর্থনীতির চাকা সচল রয়েছে।

অভিবাদন জানাচ্ছি সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদ-শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং শান্তি-স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-প্রগতির জন্য সারা দুনিয়ায় সংগ্রামরত সব মানুষকে।

দ্বাদশ পার্টি-কংগ্রেসের এই ঐতিহাসিক মঞ্চ থেকে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কমরেড-সাথি-বন্ধুদের, যাঁরা শান্তি, সমৃদ্ধি, গণতন্ত্র, ভ্রাতৃত্ব, ইনসাফ, প্রগতি ও মানবমুক্তির জন্য নানাভাবে অমূল্য অবদান রেখে আমাদের মধ্য থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। প্রয়াত সব কমরেড, সাথি ও বন্ধুর স্মৃতিকে সামনে রেখে আমরা আবার দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছি-তোমাদের সংগ্রাম, সাধনা ও আত্মত্যাগকে বৃথা যেতে দেব না!

প্রিয় সাথি-বন্ধুগণ,

গত দুই বছর ধরে করোনা-মহামারিতে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত। সেই বিপর্যয়ের হাত থেকে আমাদের দেশও মুক্ত নয়। এখনও করোনার অভিঘাত অব্যাহত আছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১ বছর ৪ মাস পরে দ্বাদশ কংগ্রেস করতে হচ্ছে।

‘দুঃশাসন হটাও, ব্যবস্থা বদলাও, বিকল্প গড়ো’-এই আহ্বান জানিয়ে এবং সাম্প্রদায়িকতা সাম্রাজ্যবাদ ও লুটপাটতন্ত্রকে পরাজিত করে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা এই মহতী সমাবেশে মিলিত হয়েছি। এবারের দ্বাদশ কংগ্রেসে আমরা একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, দুর্নীতি, লুটপাটতন্ত্র ও গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে দৃঢ় সংকল্প ও সংগ্রামের অঙ্গীকার নিয়ে সমবেত হয়েছি। আমরা আপনাদের সামনে ঘোষণা করছি যে, দ্বাদশ পার্টি-কংগ্রেস সেই সংগ্রামের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যাভিমুখে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।

কমরেড ও বন্ধুগণ,

সরকার বলছে, দেশে নাকি উন্নয়নের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, আর সেই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রকে আপাতত বাক্সবন্দী করে রাখতে হবে। তাই দেখি, নির্বাচনের নামে চলে প্রহসন। দিনের ভোট রাতে হয়ে যায়। চলছে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস। দেশ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এ সবই নাকি মুখ বুজে সহ্য করতে হবে! কারণ উন্নয়ন দরকার। আমরা আপনাদের সামনে সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই-আমাদের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি কোনোভাবেই গণতন্ত্রের নির্বাসন ও একদলীয় শাসন মেনে নেবে না। গণতন্ত্র আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম স্তম্ভ।

সরকার বলছে-উন্নয়ন চান, নাকি গণতন্ত্র চান। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সাংঘর্ষিক নয়, পরস্পরে পরিপূরক। কমিউনিস্ট পার্টি উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। কমিউস্টি পার্টি উন্নয়নও চায়, গণতন্ত্রও চায়। কিন্তু কার উন্নয়ন? লুটেরাদের না জনগণের? কমিউনিস্ট পার্টি সুষম উন্নয়ন চায়। জনগণের উন্নয়ন চায়। সরকার যে উন্নয়নের কথা বলছে, সেই উন্নয়ন জবলেস ও চাকরি-শূন্য উন্নয়ন, লুটপাটের উন্নয়ন। উন্নয়ন হয়েছে কিছু লোকের-লুটেরা ধনিক শ্রেণির, আর সরকার দলীয় লুটপাটকারীদের। আমাদের দেশের শ্রমিকরা এখনো পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন মজুরি পায়। কৃষক তার ফসলের দাম পায় না। লাখো মানুষ কাজের সন্ধানে সমুদ্রে ভাসে, যাদের শেষ ঠিকানা হয় জঙ্গলে, কবরে, সাগরে। যে উন্নয়ন শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের ভাত কাপড় জমি কাজ ও পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তাকে আমরা উন্নয়ন বলি না।

বন্ধুগণ,

আমাদের দেশে এখন যা চলছে, তা হলো নিকৃষ্ট পুঁজিবাদ। লুটেরা ব্যবসায়ী, লুটেরা আমলা, সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তদের এক চক্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হয়ে রয়েছে। একদিকে শোষণ, অন্যদিকে দুর্নতি ও বিদেশে টাকা পাচার। বিনিয়োগ হয় না দেশে। ফলে কর্মসংস্থানও হয় না। বাজারসর্বস্ব অর্থনীতির কল্যাণে আজ শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাত ও খাবার পানি পর্যন্ত কেনাবেচার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। সরকারের এই নীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম ভিত্তি সমাজতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি বৈরিতা। বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীর বিচার করলেও, সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শকে নানাভাবে টিকিয়ে রাখছে। জিয়া-এরশাদের চালু করা সংবিধানের সাম্প্রদায়িকীকরণ ও রাষ্ট্রধর্ম রেখে দেয়াই এর বড় উদাহরণ।

দেশীয় ধনীদের লুটপাটের বাইরে আছে আরো বড় লুণ্ঠনকারী-সাম্রাজ্যবাদ, যারা মধ্যপ্রাচ্যে দেশ দখল ও গণহত্যা চালাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার রুগ্ণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার জন্য পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধোন্মাদনা বৃদ্ধি করে চলেছে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর-ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে। ইউরোপ ও পূর্ব ইউরোপে যুদ্ধ পরিস্থিতি তুঙ্গে। শান্তি-স্বাধীনতা-প্রগতি ও মানবতার দুশমন সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদও লুণ্ঠন করছে বেপরোয়াভাবে। প্রসঙ্গক্রমে ভারতের কথাও আসে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরকার ও জনগণ যে সহযোগিতা করেছিল, তা আমরা কৃতজ্ঞতা সহকারে স্মরণ করি। কিন্তু ভারত গঙ্গা-তিস্তাসহ প্রায় সব নদীর পানির ন্যায্য হিস্সা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে এবং প্রায় প্রতিদিন সীমান্তে মানুষ হত্যা করে যে বৈরি পরিবেশ তৈরি করেছে, আমাদের পার্টি তার বিরুদ্ধেও সোচ্চার। আমাদের সরকার ভারতের স্বার্থের কাছে জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে, এমনকি দুই দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ‘রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প’ স্থাপনের যে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে তাতে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।

কমরেডগণ,

সরকারের বাইরে যে বুর্জোয়া দল রয়েছে তারাও একই বাজারসর্বস্ব পুঁজিবাদী পথ এবং লুটপাটতন্ত্রের নীতির অনুসারী। উপরন্তু তারা মৌলবাদী দল জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে রাজনীতিকে কলুষিত করছে।

আসুন, আমরা দুই বড় বুর্জোয়া দলকে প্রত্যাখ্যান করি। গড়ে তুলি বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প। সেই বিকল্প গড়ে তুলবে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত ও দেশপ্রেমিক মানুষের স্বার্থের অনুকূলে বিকল্প রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বহু সংগ্রামের ঐতিহ্যে ভরপুর, সংগ্রামে-ত্যাগে মহীয়ান দেশের প্রাচীনতম পার্টি-বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আজকের এই যুগসন্ধিক্ষণে সেই বিকল্পের আহ্বান জানাচ্ছে।

বন্ধুগণ,

আসুন, আমরা স্বপ্ন দেখি মানুষকে স্বপ্ন দেখাই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিই। আসুন, গড়ে তুলি শাসক ও শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের বিকল্প শক্তি-সমাবেশ, বিকল্প ক্ষমতা-কেন্দ্র, বিকল্প নেতৃত্ব। পার্টির লাল পতাকাতলে সমবেত হয়ে সমাজতন্ত্রের লড়াইকে অগ্রসর করি। ভাতের লড়াই, ভোটের লড়াই, গণতন্ত্রের লড়াই, সমাজ বদলের লড়াই, বিকল্প গড়ার লড়াইয়ে কল-কারখানা, ক্ষেত-খামার, পাড়া-মহল্লা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আসুন ঝাঁপিয়ে পড়ি। এ হোক দ্বাদশ কংগ্রেসের অঙ্গীকার।

মেহনতি মানুষের জয় হোক।

দুনিয়ার মজদুর এক হও!

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জিন্দাবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.