আত্মগোপন কমিউনিস্ট পার্টির পরম শুভার্থী –শ্রদ্ধেয় মুশতারী শফী

অশোক সাহা 

হিন্দু মুসলিম গলা কাটাকাটি করে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে হাজার মাইলের ব্যবধানে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালিত হতো জমিদার ভূস্বামী কায়েমী স্বার্থবাদী সামরিক ছাউনি থেকে। প্রথম থেকেই কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তানকে কৃত্রিম রাষ্ট্র আখ্যা দিয়েছে। সরকার পার্টিকে বেআইনী করে। চালায় চরম অত্যাচার নির্যাতন। সাথে গ্রেপ্তার হুলিয়া। কমিউনিস্ট পার্টি আত্মগোপনে থেকে লড়াই সংগ্রাম পরিচালনা করতে থাকে।

বেআইনী অবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টিকে আত্মগোপনে কাজ করতে হয়েছে নানা অত্যাচার নিপীড়ন সয়ে। কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে অনেক সুহৃদ শুভার্থী পার্টিকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। আশ্রয় দিয়েছেন। সহযোগিতা করতে গিয়ে অনেক শুভানুধ্যায়ী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। জীবন ঝুঁকিতে পড়েছেন।

শ্রদ্ধেয় মুশতারী শফী আপার পরিবারও ছিল বেআইনী আত্মগোপন কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ সুহৃদ, শুভাকাঙ্খী। এ রকম আছে আরো অনেক অসংখ্য পরিবার ছিল সারা বাংলা জুড়ে। জনারন্যের অন্তরালে সে এক ভিন্ন ইতিহাস।

পাকিস্তানী হানাদার কবলিত চট্টগ্রাম শহরে প্রতিরোধ প্রস্তুতির এক পর্যায়ে ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টির সংগৃহীত গোলা বারুদ সংরক্ষনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল খ্যাতিমান চিকিৎসক ডা: শফি সাহেবকে। এ ছিল ভীষন ঝুঁকিপূর্ন দায়িত্ব। যে কোন মূহুর্তে বিপদ ঘটে যাবার আশঙ্কা ছিল।

কেমন করে পাকিস্তানী দালালরা তা জেনে যায়। যা হবার তাই হল। হানাদার বাহিনী সদলবলে ডাক্তার সাহেবের বাড়িতে আক্রমন চালিয়ে তাঁকে পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলো। নৃসংশ খুন করা হলো বেগম মুশতারী শফীর জীবন সাথী ডা. শফি সাহেবকে। সাথে খুন করা হলো মুশতারী আপার ছোট ভাইকে। এক পরিবারে দুই খুন। দুইজন শহীদ হলেন।

সেই থেকে আমাদের আপা বেগম মুশতারী শফী শহীদ জায়া এবং শহীদ ভগ্নী। বেছে নিলেন লড়াই সংগ্রামের বন্ধুর, কঠিন জীবন।

স্বাধীনতার পর মনকে শক্ত করে লড়তে লড়তে তিনি পঞ্চাশটি বছর পার করলেন। অসীম সাহসে লড়েছেন জীবনের শেষ অব্দি। জীবন সংগ্রামের অভিযাত্রায় বাংলাদেশও সুবর্ণ জয়ন্তীতে পা রাখলো।

বেদনায় নীল হয়ে ঘরে বসে থাকেন নি তিনি। অসীম সাহসে-সংগ্রামে সংগঠনে ঝাপিয়ে পড়লেন। মহিলা পরিষদের নেতৃত্ব দিলেন। নারী আন্দোলনের সাহসী নেত্রী ছিলেন। সকল অন্যায় অত্যাচার নিগ্রহের বিরুদ্ধে সামনে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন।

কলম হাতে নিলেন। লিখে গেছেন অবিরাম যতদিন শক্তি-সাধ্য ছিল। জীবনের শেষ অব্দি। কবিতা, গল্প, ছড়া, উপন্যাস, ইতিহাস, স্মৃতিকথা সব কিছু। সৃজনশীল জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। সাথে গুছিয়েছেন নিজের সমস্যা জর্জরিত সংসার, সন্তান।

তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম তথা দেশের সুস্থ অসাম্প্রদায়িক ধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম দিশারী। ছিলেন চট্টগ্রাম উদীচীর সভাপতি। ৭১’র ঘাতক-দালাল বিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে সামনে থেকে চট্টগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

শোষক-লুটেরা-হার্মাদ-দুবৃত্ত-খুনী ধর্ষকের বিরুদ্ধেও ছিলেন তিনি সদা সোচ্চার। এদেরকে প্রাণ ভরে ঘৃনা করতেন। আপাত সুবিধার জন্য কোথাও নিজের শহীদ জীবনসঙ্গী এবং ভাইকে অপমান করেন নি কখনো। ইস্পাত কঠিন নৈতিকতা নিয়ে আপোসহীন জীবন অতিবাহিত করেছেন। সুবিধাবা, অনৈতিকতা তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি।

প্রয়ানের মাত্র দেড় মাস আগে অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে এসেছেন সম্প্রতি পুজা মন্ডপসহ সারাদেশে নৃসংশ সাম্প্রদায়িক আক্রমন ও হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে চট্টগ্রামের ডি সি হিল পার্কে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে।

কোথায় ছিলেন না তিনি। যেখানে অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অসভ্যতা, অনাচার, হত্যা, ধর্ষন, নারীর প্রতি সহিংসত-খুন, অসাম্য, বৈষম্য, নীপিড়ন, নির্যাতন, দুবৃত্তপনা সর্বত্র সাহসের সাথে ছুটে গেছেন আমাদের প্রিয় মুশতারী আপা।

কুন্ঠাহীন চিত্তে দাঁড়িয়েছেন নীপিড়িত-নিগৃহীত নারীসহ সাধারণ মানুষের পাশে। একটি শোষনমুক্ত, সুখী, সুন্দর বাংলাদেশ ছিল তাঁর সকল সংগ্রামের আলোকিত অধ্যায়।

শহীদ ডাক্তার শফি সাহেবের জীবনদানকে মহিমান্বিত করেছের পঞ্চাশ বছর ধরে রাজপথের সাহসী সংগ্রাম করে। সাহস যুগিয়েছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। ছিলেন কঠিন কঠিন লড়াইয়ের উৎসাহের ভরসাস্থল।

দেশ মাতৃকার বেদীমূলে উৎসর্গ করেছেন তিনি নিজের সমগ্র জীবন-সংগ্রামকে। অমূল্য জীবনকে।

সাহসী নেত্রী বেগম মুশতারী শফী। স্বাধীনতার সূর্যকন্যা।

সার্থক জনম তাঁর।

সালাম-প্রণাম আপা।

আপনাকে মনে থাকবে অনেক অনেক দিন।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, চট্টগ্রাম জেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.