আগুন নিয়ে এই মরণ খেলা রুখতে হবে: রুহিন হোসেন প্রিন্স

আবার ঢাকার বস্তিতে আগুন। এবার আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হলো রাজধানী ঢাকার মিরপুরের একটি বস্তির প্রায় ৩ হাজার ঘর। বাস্তুহীন হলো ১৫/২০ হাজার মানুষ।

মিরপুর চলন্তিকা বাস স্ট্যান্ডের মোড় ঘুরলেই বায়ে সরু রাস্তা। দু’পাশে কিছু দোকান, টিনের ছাপড়া দোতালা। একটু এগুলেই ডোবা জায়গায় বাঁশের মাচার উপর গড়ে ওঠা অসংখ্য বস্তিঘর। আবার ডানে, বায়ে, সোজা তাকাতে উঁচু উঁচু অট্টালিকার সারি।’ এই চিত্রটি মাত্র ক’দিন আগেও ছিল। আগুনে পুড়ে তার সবটাই আজ একটি পোড়া মাটির পরাবাস্তব প্রান্তরের ছবি।

গত ১৭ আগস্ট বিকালে একই জায়গায় গিয়ে দেখা গেল সরু রাস্তায় ঢুকতেই পোড়া ঝাঁঝালো গন্ধ। একটু এগুলেই ডোবা জায়গায় ভস্মীভূত বাঁশ, খুঁটি, পোড়া হাড়ি-বাসন, পোড়া কাপড়, পোড়া টিনের কিছু চিহ্ন। আর একেবারে মাঝে পোড়া বিরান ভূমি। চারিদিকে উঁচু অট্টালিকার মাঝে নীচু ডোবা জায়গায় পোড়া ধ্বংসের চিহ্ন। আগে যারা দেখেননি, তাদের কেউ কেউ জানতে চাইলেন, ‘এরকম ডোবায় কিভাবে ঘর উঠানো হয়েছিল? এখানে ৭/৮ হাজার ঘর বাড়িতে ৪০/৫০ হাজার মানুষ বাস করতো কিভাবে?’

দেখা গেল এক পাশে পোড়া বাঁশের মাচা। ওখানে দাঁড়িয়ে উৎসুক মানুষ ধ্বংসস্তুপ দেখছেন। মাইকে ঘোষণা এসেছে, বাঁশের মাচা থেকে নামুন, যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। একেবারে ছাই হওয়া জায়গায় অনেকে ঠিকানা খুঁজতে ব্যস্ত। আর পোড়া ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকে, কান্নার শক্তি হারিয়ে ফেলা মানুষগুলো।

জানা গেল, এরকম বাঁশের মাচার উপর গড়ে উঠেছিল, বাঁশের খুঁটির উপর একতালা, দোতালা বস্তি। শুধু এখানে না ঢাকার অধিকাংশ বস্তির চিহ্ন এমন। ডোবা পানিতেও বাঁশের খুঁটি ও মাচায় দোতালা, তিন তলা বস্তির দেখা পাওয়া যায়। আর ফুটপাতে বা ফুটপাতের পাশ ঘিরে বস্তি তো আছেই। তিলোত্তমা(!) রাজধানীতে এরকম সাড়ে তিন হাজার বস্তিতে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের বসবাসের খবর তো আমরা জানি।

নদী ভাঙন, জমিজমা না থাকা, গ্রামে আয়ের সুযোগ না থাকা, দারিদ্র, জলবায়ু উদ্বাস্তু, বিভিন্ন কারণে শহরে আসছে গৃহহীন, আয়হীন, ঠিকানাহীন মানুষ। এইতো চলন্তিকা বস্তির নিঃস্ব এক বাসিন্দা হাত ধরে বললেন, ‘উপায়হীন হয়ে শহরে আসি। গ্রামে আমাদের জমিজমা থাকলে, কাজ করার সুযোগ থাকলে শহরে আসতাম না।’

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর আমরা পালন করতে যাচ্ছি। অথচ বেঁচে থাকার জন্য ঢাকায় এসে অমানবিক পরিবেশে ঠাঁই নেওয়া বস্তিবাসীদের জন্য ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করা যায়নি।

সারাদেশের গ্রাম উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেই, খাস জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের নীতি নেই। তেমনই, নগর পরিকল্পনায়ও এসব দরিদ্র বস্তিবাসীর উন্নয়ন থাকে উপেক্ষিত। এই পরিস্থিতিতে স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেই টিকে থাকে বস্তিবাসী মানুষ। আর ছিন্নমূল, ছোট আয়ের বা আয় না থাকা মানুষের প্রথম ঠিকানা হয় বস্তি।

বস্তিতে ঠাঁই নেওয়া মানুষের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার অধিকার বিশ্ব স্বীকৃত। আমাদের দেশেও এই অধিকারের লড়াই চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এর মধ্য দিয়ে আইনগত ও নীতিগতভাবে বস্তিবাসীদের জন্য সিটি করপোরেশনের কতক করণীয় নির্ধারণ করা আছে। গত ২৫ বছরে বস্তিবাসীদের জন্য অনেক নির্দেশনা আদালত থেকে দেয়া হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব খায়রুল হকও তাঁর রায়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন ঢাকার একটি বস্তির সব বাসিন্দাকে দুই বছরের মধ্যে পুনর্বাসন করার জন্য। কিন্তু তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে, যেমন পাবলিক ওয়ার্কস, রাজউক ইত্যাদিকে। কিন্ত তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা নেই।

ঢাকা মহানগরের অধিকাংশ বস্তি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে। তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা দেখি না। দেখি শুধু উন্নয়নের গাল ভরা বুলি আওড়িয়ে কৌশলে উচ্ছেদ পরিকল্পনা করতে।

নগরের পরিকল্পনায় নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক তো দূরের কথা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষরাই অবহেলিত। সেক্ষেত্রে আবাসন, পয়ঃব্যবস্থাপনা, খাবার পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ নানা ক্ষেত্রে বস্তিবাসী মানুষগুলোর জন্য এ নগরীর পরিকল্পনা কিছু আছে বা থাকবে তা ভাবাই যায় না। তবে নগর বাজেটেও বস্তি উন্নয়নে বরাদ্দ এসেছে (নামমাত্র হলেও)। বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য কিছু কিছু সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে কোথাও কোথাও।

প্রধান সমস্যা হলো, বস্তিবাসীদের উপস্থিতির বাস্তবতা স্বীকার করে, তাদের উন্নয়ন ও বিকল্প পথ নির্দেশনায় সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। বেঁচে থাকার জন্য গ্রাম ছেড়ে এসব দরিদ্র মানুষকে একমাত্র ঢাকায় যাতে না আসতে হয়, তার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নেই।

বস্তির অধিকাংশই ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা অথবা স্থানীয় ‘দালাল চক্রের’ নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠিত। ‘ভাড়া দেওয়া’, নানা সময় বিভিন্ন নামে ‘চাঁদা দেওয়া’, আর অমানবিক জীবন নিয়ে বস্তিতে বসবাসকারীদের অন্যতম আতঙ্ক হলো ‘উচ্ছেদ’। এই উচ্ছেদ এক সময় সহজ ছিল। বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি, মানবিক ব্যক্তিবর্গ, প্রচার মাধ্যম এমনকি আদালতের নির্দেশনার কারণে পুনর্বাসন ছাড়া সরাসরি উচ্ছেদ এখন সহজ সাধ্য নয়।

তাই উচ্ছেদের নতুন পথ হলো অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব করে দেওয়া, ভীতি প্রদর্শন করা। এর মধ্য দিয়ে যেন নিজেই চলে যায়। এই ভাবেই ঐ এলাকা দখলে নেওয়া হয়। এমনিতে বস্তির অপরিকল্পিত গঠনের কারণে আগুন লাগার বাস্তব সম্ভাবনা থাকে। কোথাও কোথাও অসাবধানতায় আগুনও লাগে। তবে বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশ্ন দেখা দেয়, বস্তিতে আগুন লাগে কেন? মিরপুরের চলন্তিকা, ঝিলেরপাড়, ৭নং ও আরামবাগ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের পরও এই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। নিকট অতীতে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পর এসব প্রশ্ন এলেও তার সুরহা করা যায়নি।

এইতো ক’বছর আগে কল্যাণপুর পোড়া বস্তি উচ্ছেদ করতে যেয়ে ব্যর্থ হয় পূর্ত বিভাগ। আদালতও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এরপর দেখা গেল পরদিন সকালেই বস্তিতে আগুন লাগলো। সহজে যাতে আগুন নেভান না যায়, সেজন্য দমকল বাহিনীকে বাধাও দেয়া হয়। দুর্বৃত্তদের দিয়ে এ কাজ করা হয়।

তবে সাধারণভাবে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে ঐ বস্তি এলাকাসমূহের সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করতে, বড় বড় বাড়িঘর তোলার জন্যই বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করার নানা সুযোগ নেওয়া হয়। এ জন্যই সুবিধামত সময়েই সংগঠিত হয় অগ্নিকাণ্ড। অগ্নিকাণ্ডের পর বস্তিবাসীদের সরিয়ে নেয়া ও বিকল্প কর্মসংস্থানের গালভরা বুলি আওড়ালেও ক’দিন পর তা ফিকে হয়ে যায়। কোথাও বস্তিবাসীদের সরে যেতে বাধ্য করা হয়। অনেকে নিজ থেকে চলে যান। আগুন ‘লেগেছে’, নাকি আগুন ‘লাগানো’ হয়েছে তা নিয়ে তাই প্রশ্নই থেকে যায়।

গাইবান্ধায় আদিবাসী পল্লী উচ্ছেদের জন্য স্থানীয় চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাঁওতালদের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিজ হাতে আগুন লাগিয়েছিল। সেই ঘটনার ভিডিও চিত্র দেশবাসী দেখেছে।

পুড়ে যাওয়া এলাকায় বস্তিবাসীদের জন্য বরাদ্দ নিশ্চিত করে প্রকৃত বস্তিবাসীদের ঘর দেয়া গেলে, আগুন ‘লেগেছে’, নাকি আগুন ‘লাগানো’ হয়েছে এ প্রশ্ন উঠতো না। অন্যত্র নামেমাত্র বস্তিবাসীদের জন্য নির্মিত ‘ফ্ল্যাট’ একদিকে অপ্রতুল, অন্যদিকে এর বরাদ্দ পাচ্ছে বস্তিবাসী নামধারী টাকাওয়ালারা। তাই ‘বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে ফ্ল্যাট’ আর বস্তিবাসীদের মনোযোগ কাড়ছে না। বস্তি ছেড়ে ফ্ল্যাটের ওঠার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে পারছে না।

বস্তিতে আগুন লাগা নিয়ে সংশয় দূর করতে তাই প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। এবং তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ করে দায়ী ব্যক্তি ও ঘটনাবলীতে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অনেক সময় বলা হয়ে থাকে বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন প্রচুর। এসব লাইন যথাযথভাবে স্থাপন করা হয় না। তাই এসব জায়গা থেকে আগুন লাগতে পারে। এছাড়া অসাবধানতা তো রয়েছেই। তথ্য উপাত্তে দেখা যায় যেভাবেই হোক বস্তিবাসী বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহার করতে পারলে তারা টাকা দিয়েই এসব ব্যবহার করেন। বৈধ পথে লাইন না পেলে এ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। চলে যায় স্থানীয় দালালদের হাতে। ভাগ যায় দুর্বৃত্তায়িত চক্রের নানা জনের কাছে। তাই, আগুন লাগা বন্ধ করতে হলেও বিদ্যুৎ, গ্যাসের লাইন যথাযথভাবে স্থাপন করাকে জরুরি কাজ বিবেচনা করা দরকার।

বস্তিবাসীদের বাস্তবতা বিবেচনা করে পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বস্তি গড়ে সংশ্লিষ্ট বস্তিতেই নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে এগুতে হবে।

বস্তিকে অনেক সময় মাদক ও অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এটা ঠিক দুর্বৃত্তরা অনেক সময় এসব কাজে বেকার, ছিন্নমূল মানুষকে ব্যবহার করে। এসব দুর্বৃত্তরা কোনো না কোনোভাবে প্রশাসন ও ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় লালিত হয়। এসব অপরাধে বরঞ্চ অভিজাত এলাকার বিত্তবান পরিবারগুলোই বেশি জড়িত। তাই এজন্য বস্তিবাসীদের ঢালাও দোষারোপ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। নগর গবেষক অধ্যাপক নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘বস্তিবাসীরা নিরীহ ও সাধারণ মানুষ, তাদের সম্পর্কে এসব অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়।’

এই শ্রমজীবী মানুষ ছাড়া তিলোত্তমা(!) রাজধানীবাসী অচল। বস্তিতে বসবাসকারীরাই গৃহকর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, রিকশা-টেম্পু চালক, ছোট দোকানদার আর শ্রমজীবী মানুষ। নগর জীবন সচল রাখতে এদের ছাড়া একদিনও স্বাচ্ছন্দের সাথে চলে না অর্থবিত্তের মালিকদের।

আগুন লাগিয়ে বা আগুন লাগার উৎস উন্মুক্ত রেখে এদের উচ্ছেদ কোনো বিবেকবান মানুষ গ্রহণ করে না। বস্তিবাসীদের বিকল্প বাসস্থান নিশ্চিত করে, কর্মসহায়ক মানবিক জীবন দেয়াই আমাদের লক্ষ্য হওয়া দরকার। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, শ্রমজীবীদের জন্য ডরমেটরি নির্মাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি নির্ভর সামগ্রীক অর্থনীতি– বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠন, সর্বত্র শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি, নদী ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উদ্বাস্তুদের বিকল্প বাসস্থান পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছাড়া রাজধানীমূখীন ছিন্নমূল মানুষের ঢেউ ঠেকানো যাবে না।

এজন্য পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এটি না করে, সামগ্রিকভাবে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া বস্তি ‘উচ্ছেদ’, আর তার জন্য ‘আগুন’কে পুঁজি করে যে কোনো হীন কর্মকাণ্ড কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নেবে না। এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আগুন নিয়ে এই হীন মরণ খেলা রুখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.