আইন অমান্য করে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়াতে তৎপর ব্যবসায়ীরা

রুহিন হোসেন প্রিন্স

নিয়মানুযায়ী গণশুনানি করে সবধরনের জ্বালানির দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এর। বিইআরসি এ কাজটি যথাযথভাবে করেনি, এখনো করছে না।

২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি বেসরকারি খাতে বিক্রি কারা তরলকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ঠিক করতে বিইআরসি গণশুনানির আয়োজন করে। এর ভিত্তিতে গত ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মত এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে আদেশ জারি করে বিইআরসি। গণশুনানিতে উপস্থিত থেকে আমরা, জনস্বার্থের প্রতিনিধি ও দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞরা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে যে দাম নির্ধারণের কথা বলেছিলাম তা মানা হয়নি। তারপরও বিইআরসি মূল্য নির্ধারণের একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করে আদেশ জারি করে। আমরা আপত্তি সত্ত্বেও ঐ দাম কার্যকর করার কথা বলি। অথচ এটি না মানা অপরাধ জেনেও ঐ দাম মানতে আপত্তি জানায় ব্যবসায়ীরা। এবং বাজারে বেশি দামে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি অব্যাহত রাখে।

বেসরকারি খাতে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের সারা বছর গড় দাম ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা নির্ধারণের আমাদের যুক্তিপূর্ণ দাবি ছিল। কিন্তু গত ৩১ মে ২০২১, এলপিজি মূসকসহ ৯০৬ টাকা থেকে কমিয়ে ৮৪২ টাকা করা হয়। ১ জুন থেকে তা কার্যকর হয়। তারপরও দেশের কোথাও খুচরা বিক্রির দোকানে ঐ দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এই দাম নির্ধারণের পর স্থানীয় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দাম কার্যকর ও দাম কার্যকরের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পালন করার কথা।

অথচ দেখা গেল ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো এই দাম কার্যকর করছে না। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সিলিন্ডার প্রতি দাম বেশি নিচ্ছে। আর নানা সমস্যার কথা বলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযানের শিথিলতার কথা জানিয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আইন অমান্য করে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি না করে কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। আর দাম বাড়াতে নতুন করে বিইআরসিকে গণশুনানি করতে বাধ্য করছে। তাদের নিয়ন্ত্রিত পত্রপত্রিকায় মনগড়া প্রতিবেদন প্রকাশ, পাঁচতারকা হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে ‘ব্যবসায়ে ক্ষতির’ কথা বলে চলেছে। এ অবস্থায় বিইআরসি আগামী ৭ জুলাই নতুন করে গণশুনানি আহ্বান করেছে।

২. ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিতে বেসরকারি খাতে এই ব্যবসা উন্মুক্ত করা হয়। সরকারি খাতে দেশের গ্যাস থেকে কিছু সিলিন্ডার গ্যাস বাজারজাত করা হলেও চাহিদা পূরণে বর্তমান ও বিগত গণবিরোধী সরকারগুলো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও নারীর স্বাস্থ্য বিবেচনায় রান্নায় গ্যাস ব্যাবহার সর্বত্র অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

দেশে স্থলভাগে, সমুদ্র ভাগে গ্যাস থাকলেও যথাযথ অনুসন্ধান ও উত্তোলন না হওয়ায় সাধারণ মানুষ দেশের গ্যাসের সুফল ভোগ করতে পারছে না। গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ কিছু জেলায় দেশের গ্যাস পাইপ লাইনে সরবরাহ করা হয়। ঘরে ঘরে এই গ্যাস দেয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। তাই প্রয়োজনকে সামনে রেখে বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানি করে ব্যবসায় তৎপর হয়ে ওঠে ব্যবসায়ীরা।

বাজারে ২০১৩ সালে ৮০ হাজার মেট্রিক টনের চাহিদা থাকলেও এখন চাহিদা ১২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। এই চাহিদা আরও বিপুল পরিমাণ বাড়বে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামী ৫ বছরে এই চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন হবে বলে অনেকের ধারণা। ব্যবসায়ীরা তাই এই ব্যবসায় বিশেষ ভূমিকায় নেমে গেছে। ব্যবসায়ীরা এতোদিন এই এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নিজেদের মতো নির্ধারণ করে বাজারে বিক্রি করতো। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের বলার কিছু ছিল না।

২০০৯ সালে বিইআরসি সরকারি ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৭০০ টাকা নির্ধারণ করে। এরপর আর এই দায়িত্ব পালন করেনি। বোঝাই যায়, এখতিয়ার থাকলেও ব্যবসায়ী ও সরকার না চাওয়ায় বিইআরসি এই দায়িত্ব পালন করেনি। আর এই ফাঁকে ব্যবসায়ীরা জনগণের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভারি করেছে। কমিশনভোগীরাও তাদের পকেট মোটা করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে সিলিন্ডার গ্যাসের যৌক্তিক দাম নির্ধারণে আমাদের দাবিতে কর্ণপাত করা হয়নি। অবশেষে হাইকোর্টের নির্দেশে বিইআরসি গণশুনানি করে দাম নির্ধারণ করে। এবং ইতোমধ্যে ৩টি আদেশ দেয়। ব্যবসায়ীরা এই আদেশ মানেনি। যে ১৮টি কোম্পানি সিলিন্ডার গ্যাস বাজারে বিক্রি করছে তারা বিইআরসি’র লাইসেন্সী। লাইসেন্সী কর্তৃক বিইআরসি’র আদেশ না মানাবিইআরসি আইনের ৪৩ ধারা মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই শাস্তি অর্থদণ্ড অথবা কারাদণ্ড । কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এমনকি নির্ধারিত মূল্যের থেকে বেশি দামে বিক্রি একটি ফৌজদারি অপরাধ। বিইআরসি আইনের ৪৬ ধারায় এই অপরাধের দায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। দাম যথাযথ কার্যকর না হওয়ায় বিইআরসি জনগণের স্বার্থে এটি প্রয়োগের কোনো ভূমিকা আমরা দেখছি না।

আর ব্যবসায়ীরা আইন না মেনে, নতুন মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। বরং এটাকে আমলে নিয়ে বিইআরসি গণশুনানির আয়োজন করেছে। যা গ্রহণযোগ্য নয়। বিইআরসিকে প্রথমে ব্যবসায়ীদের আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। তারপর প্রয়োজনে গণশুনানির পথে যাওয়াই হবে যৌক্তিক।

৩. এবার দেখা যাক, দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের আপত্তি কতটা যৌক্তিক। যতটুকু জানা যায় দাম নির্ধারণে বিইআরসি যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, তা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ ১৪টি দেশও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

এ ক্ষেত্রে গ্যাস আনতে জাহাজ ভাড়া, বোতলজাতকরণ, পরিবহণ, ব্যাংক সুদ, মূসক, সিলিন্ডারের আয়ু, ডিলার ও খুচরা পর্যয়ে লভ্যাংশ, ডলারের মূল্য ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। আর এগুলোর যৌক্তিক কিছু পরিবর্তন ছাড়া মানদণ্ড স্থির রাখা হয়। আর মূল্য ‘পণ্য গ্যাস’ এর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি মাসে উঠানামা করে। সেই অনুযায়ী গ্যাসের দাম ধরা হয়। প্রতি মাসের দাম বিবেচনা করে অথবা গড় দাম বিবেচনা করে খরচসহ সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়।

বিইআরসি প্রতি মাসে এই দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে, গত ৩ মাস ধরে এই দাম ঘোষণা করে চলেছে।

গণশুনানিতে ব্যবসায়ীরা জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ যা দেখিয়েছিল, তা আমাদের কাছে এমনকি বিইআরসি’র কাছেও যৌক্তিক মনে হয়নি। এমনকি বিইআরসি’র টেকনিক্যাল কমিটি যে প্রস্তাব করেছিল আমরা তার বিরুদ্ধেও যুক্তি তুলে ধরেছিলাম।

একটি বিষয়ে বলি। অন্যতম খরচ হলো জাহাজ ভাড়া। ছোট জাহাজে অল্প গ্যাস আনতে যে খরচ বড় জাহাজে আনলে তার খরচ অনেক কম। ব্যবসা ও নিজস্ব কোম্পানির ক্ষমতা বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা ছোট জাহাজে গ্যাস আনেন। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যৌথভাবে বড় জাহাজে গ্যাস আনলে খরচ পড়বে অনেক কম। প্রয়োজনে সরকারও এক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। একথা আমরা বার বার বলেছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এ পথে হাঁটতে রাজি নন। তারা যে হিসাব দেখান তাতে নানা কারসাজির সুযোগ থাকে। একথা নানা মাধ্যমে শোনা যায়। এক্ষেত্রে খরচ কমাতে পারলে গ্যাসের দামও কমে আসবে। সাধারণ মানুষ কম দামে গ্যাস পাবে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। এছাড়া ডিলার, খুচরা বিক্রেতাদের লাভ ও অন্যান্য খরচের যে হিসাব ব্যবসায়ীরা দিতে চান তা মোটেই যৌক্তিক না। গণশুনানিতে তারা এর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে পারেননি।

এতোদিন একচেটিয়াভাবে নিজেরা দাম নির্ধারণ করে যে মুনাফা করেছে, এর বিপরীতে যৌক্তিক মুনাফা নির্ধারিত হওয়ায় (ব্যবসায়ীদের হিসেবে কমে যাওয়ায়) তারা মানতে পারছে না। নানাভাবে বাড়তি দাম অব্যাহত রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। অথচ বিগত দিনে তারা বাড়তি টাকা নিয়েছে। এমনকি ২৫ আগস্ট ২০২০ এ হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী, বিইআরসি’র দাম নির্ধারণের আগেও তারা একাধিকবার দাম বাড়িয়েছে। এসব বেআইনি কার্যকলাপের জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ও জনগণের কাছ থেকে নেয়া বাড়তি টাকা আদায় করা প্রয়োজন।

৪. আমরা কি আমদানি করা এলপিজি’র ওপর নির্ভরশীল হবো? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ও সমাধানের পথ বের করা জরুরি। আমদানি নির্ভর গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে উঠানামা করবে। এটি যে কোনো সময় বড় সংকট সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের তো স্থলভাগে ও সমুদ্রে গ্যাস আছে। এই গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যথাযথ নজর নেই। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে দক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। অনুসন্ধান উত্তোলনে নজর নেই। নজর কেবল আমদানিতে। কারণ, এখানে ব্যাবসা ছাড়াও কমিশন ও নানা কারসাজি আছে। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। দেশে গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে আমদানিনির্ভর এলএনজি নির্ভরতা কমানো যাবে।

আমরা জানি, আমাদের দেশের গ্যাস থেকে কিছু এলএনজি সিলিন্ডার গ্যাস বাজারজাত করা হয়। সাড়ে ১২ কেজি সরকারি এই সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৯১ টাকা। এই সিলিন্ডারের একাংশ সামরিক বাহিনী ও বাকিগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকতা-কর্মচারী নেয়। এছাড়া বেআইনিভাবে বেশি দামে বাজারজাতকরণ করা হয় বলে অভিযোগ আছে। সাধারণ মানুষ এই সিলিন্ডার পায় না। এই সরকারি সিলিন্ডার গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজারজাত না হওয়ার বেসরকারি ব্যবসায়ীরা তাদের সিলিন্ডার গ্যাসের একচেটিয়া দাম নির্ধারণেরও সুযোগ নিচ্ছে।

৫. বিইআরসি জনগণের পক্ষে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করলেও যতটুকু করেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী ও কমিশনভোগীরা আজ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নানাভাবে প্রভাব সৃষ্টি করে এখনই অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক গণগুনানি করিয়ে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা করছে। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না।

সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় এর বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করা জরুরি। এ পর্যন্ত যতটুকু অর্জন, তা রক্ষার জন্য আমাদের কণ্ঠ আরও সোচ্চার করা প্রয়োজন।

এজন্য জুন মাসে নির্ধারিত বেসরকারি ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৮৪২ টাকা সর্বত্র কার্যকর করা, মানসম্পন্ন সিলিন্ডার, সঠিক মাপ ও সিলিন্ডারের গায়ে খুচরা মূল্য লেখার দাবি সামনে আনতে হবে।

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, জেলা-উপজেলা প্রশাসন দাম কার্যকরে ভূমিকা না রাখলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। ‘নালিশ কমিটি’ গঠন করতে হবে। যাতে গ্রাহক নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার কিনতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করতে পারে।

সরকারি এলপিজি’র উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো, নির্ধারিত ৫৯১ টাকা মূল্যে সরকারি সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের দরিদ্র অঞ্চলে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে পৌঁছানোর দাবি তুলে ধরতে হবে।

শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে এবং সারা বছর সাশ্রয়ী মূল্যে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে।

আমাদের নীতিনিষ্ঠ লাগাতার সংগ্রামই পারে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করতে এবং ব্যবসায়ী ও কমিশনভোগীদের অযৌক্তিক দাবি প্রতিহত করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে।

লেখক: সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.