অর্থহীন সংলাপের নাটক, আর কত?

রাজনৈতিক ভাষ্যকার

মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকেছেন। যেন তাদের কথা তাঁর কাছে, সরকারের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভবত তিনি জানেন, সরকার জানে, তাদের শরিকরাও জানে, বিরোধীরা তো জানেই- সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক একজন, একপক্ষ। তাঁর সবুজ সংকেত জানা যাবে ১৭ তারিখ। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই হবে প্রজ্ঞাপন। মাঝখানে সংলাপের নামে একটা নাটক মঞ্চস্থ হল। অনেকে বলছেন, নাটক যেন একঘেয়ে না হয়, সেজন্য আরেকটা তরিকাও আছে ক্ষমতাসীনদের। তাদের পছন্দের নামগুলো অন্যদের দিয়ে প্রস্তাব করানো। তার ফলাফল তো জানাই, এখন খালি নতুন কুশীলব কারা হন, তা দেখার অপেক্ষা।

সমস্যা হচ্ছে- এই নাটকে না রাষ্ট্র, না রাজনীতি, না বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথচলা- কোনোকিছুরই কোনো লাভ নাই। লাভ আওয়ামী লীগের। তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এরকম ইস্যু, নাটকের বারবার উপস্থাপন খুব জরুরি।

কেন এই নাটক? নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন। এত বছর হয়ে গেল, একটা আইন করা গেল না। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা গেল না, অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন দেওয়া গেল না, কয়েক দফা রাষ্ট্রপতির সংলাপ হল। আর প্রতি সংলাপের সময়ই ‘আইন এই তো হচ্ছে’ জানিয়ে প্রবোধ দেওয়াও চলছে।

অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলাও যায় না। ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী এসব কথা শুনলেই বলেন- অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে কি বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় আনতে চান? বোঝেন, এই হল এই দেশে নির্বাচন, আর তার ফল নিয়ে খোদ সরকারপ্রধানের মশকরা।

অথচ গণতন্ত্রের জন্য, সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ, অগ্রগতি, সমৃদ্ধির জন্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন একটি অতি জরুরি বিষয়। সেজন্য জরুরি নির্বাচন কমিশন গঠনও। অবশ্য কেবল নির্বাচন কমিশন গঠনই অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের প্রধান শর্ত নয়। দরকার আরও অনেক কিছু। দরকার নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার।

নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে আইন প্রণয়নসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ‘রুটিন কাজ’-এর জন্য ‘নির্বাচনকালীন সরকার’-এর বিধান সংবিধানে যুক্ত করা।

জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সব স্তরের নির্বাচনকে অর্থ, পেশিশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, ক্ষমতাসীন সরকার ও প্রশাসনের নানা কারসাজির প্রভাব থেকে মুক্ত করা। জনগণের কাছে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ভোটার কর্তৃক যেকোনো সময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার এবং পুনঃনির্বাচনের অধিকার ও ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। মেহনতি ও দরিদ্র প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বাধাসমূহ দূর করা। পর্যায়ক্রমে সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারণা কাজ সরকারি অর্থে ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা।

এখনকার আসনভিত্তিক নির্বাচন থেকে সরে এসে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিতে যাওয়া, কেননা তাতেই প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।

এসবের কোনোটাই না করে কেবল নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা জিইয়ে রাখার মধ্যে উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। তাও কমিশন হবে সরকারের পছন্দ মতো। সরকার তো নিশ্চয়ই তেমন ব্যক্তিদেরই পছন্দ করবেন, যারা পছন্দের লোককে জিতিয়ে আনতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবেন। যেমনটা আগের কমিশন করেছিল। ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ২৯ ডিসেম্বর রাতেই সেরে ফেলেছিল। নতুন কমিশনকে তো এই তেলেসমাতি ছাপিয়ে নতুন এক রেকর্ড হাজির করতে হবে; কেননা সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যে এই সরকারের কোনো সম্ভাবনাই নেই, তা আরও বছর কয়েক আগে থেকে সরকারপ্রধানই আকারে-ইঙ্গিতে স্বীকার করে আসছেন।

এর মধ্যেই সংলাপ, তাও করছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া বাকি সবকিছুই কিনা যাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে করতে হয়। তাহলে কেন এই অর্থহীন সংলাপ?

সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংগ্রাম আজকের নয়। ৭০-র নির্বাচন স্বাধীন দেশ পাওয়ার পথ স্পষ্ট করে তুলেছিল; সেই স্বাধীন দেশ তো এল, কিন্তু নির্বাচন পরাধীন হয়ে গেল। সামরিক শাসনামল টপকে ৯০-র গণআন্দোলন একটা আলোর মুখ দেখিয়েছিল, কিন্তু তারপরও আমাদের কেবল পিছনেই হাঁটতে হল। দেশ স্বাধীনতার ৫০ বছর উদপন করছে, অথচ আমরা ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই জয়ী হতে পারলাম না।

বামপন্থিরা বছরের পর বছর ধরে দেশে মানুষের ভাত ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে আসছে। দুঃশাসন হটানোর সংগ্রামের পাশাপাশি করছে নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের সংগ্রামও। কেননা, এই সংস্কার না হলে, ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য নতুন-পুরানো নাটক চালাতেই থাকবে। মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে না হলে বুর্জোয়ারা যে কতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, কতটা ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পারে, তা সম্ভবত নতুন করে আর কাউকে বোঝাতে হবে না। তাদের দুঃশাসনে মানুষের কথা বলার পথ রুদ্ধ হয়ে আসে, অন্যায়ের পর অন্যায়, শোষণের পর শোষণ আরও চেপে বসতে থাকে। স্বাধীনতা, মুক্তির অর্জনগুলো হারিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.