‘অরিত্রীপাঠ’-দুই: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মৃত্যুফাঁদ-অভিভাবকদের দায়?

কাবেরী গায়েন  

১.

একটা উন্মাদ সময় চলছে। এক সন্তান, দুই সন্তানের মা-বাবারা সবাই তাদের সন্তানকে শ্রেষ্ঠ দেখতে চান। এই চাওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। দোষ আমি দেখি, যখন তাঁদের এই চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করার জন্য সন্তানদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন। নিজেরা নীচে নামেন যতদূর নামা সম্ভব। সন্তানকে নীতিহীনতায় অভ্যস্ত করান।

আমি আমার আশেপাশে খুব কম মা-বাবাকে দেখি যাঁরা চান সন্তান শিখুক। বরং তাঁরা চান সন্তান অনেক নম্বর পাক। এবং সেটি দেখেছি আমি বহু বছর আগে থেকেই। শৈশবে আমাদের পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ একজনকে প্রথম দেখেছিলাম ছেলেকে মেডিক্যালে ভর্তি করানোর জন্য এর-তার পায়ে পড়তে, ছেলেকে মেডিক্যালে ঘুরে ঘুরে দেখতে বলেছেন, কোনোভাবে টাকা দিয়ে ওখানে ঢোকার ব্যবস্থা করা যায় কি না। সেই ছেলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মেডিক্যালের পিয়নদের পিছনে পর্যন্ত ঘুরেছেন টাকা নিয়ে। পরে আবার অনেক যন্ত্রণায় সেই গল্পও করেছেন আমাদের কাছে। এভাবে সেই বাবাকেই দেখেছি ছেলের নৈতিকতার ভিত ভেঙে দিতে। সেই আমার প্রথম দেখা অভিভাবকের লোভ। ছেলে মেডিক্যালে শেষ পর্যন্ত সুযোগ পাননি, তবে এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। সেটি মোটেই খারাপ কিছু না। এখন এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ান। অথচ অনৈতিক পিতার উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ঘুরে আসতে হয়েছে অবমাননাকর পথ।

এরপরে মহামারি মাত্রায় অভিভাবকদের নীতিহীনতা আমি দেখি আমার নিজের এসএসসি পরীক্ষার সময়। আমাদের সিলেবাসের শেষ ব্যাচ হবার কারণে সেবার যেনো নকলের উৎসব চলেছে। অনেক সহপাঠীর মা-বাবা-ভাই-বোনকে দেখেছি রিলিজিয়াসলি নকল সরবরাহ করতে। আমি দেখেছি অনেক মা-বাবাকে পরীক্ষার আগে ছেলেমেয়েকে গ্রামের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে। খুব কম সংখ্যক মা-বাবা করেন এ কাজটি, এমন নয়। অনেকেই করেন। আমার এসএসসি পরীক্ষায়, আমি খুব দুঃখের সাথে দেখেছি খুব নীতিবান মানুষদের সে কাজ করতে। কাজেই গড়ে আমাদের মা-বাবাদের ছেলেমেয়েদের ‘ভালো রেজাল্ট’-এর জন্য যে কোনো অনৈতিক কাজ করতে পিছু না হটার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। অরিত্রীরা জানে, ভালো রেজাল্ট করানোর জন্য অভিভাবকরা প্রয়োজনে ক্ষমতার কাছে ধর্ণা দেবেন, অনৈতিক পথে হাঁটবেন। তাই সেও স্কুলের প্রচলিত নিয়মের বাইরে বাবার ক্ষমতার উপরে নির্ভর করে তাঁর ‘নকল করার’ অপরাধ থেকে মুক্তি পেয়ে পরীক্ষার হলে বসতে চেয়েছে।

২.

সময় পাল্টেছে। এখন এক সন্তান-দুই সন্তানের সংসারে মা-বাবা যে বিপুল খরচ তাঁদের সন্তানদের জন্য করেন, তা দেখে বিস্ময় মানি। একজন শিক্ষার্থীকেও এখন পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ যে বেশ কয়েকটি বিষয়ে সারা বছর ‘প্রাইভেট’ পড়ে না। ধনী-গরিব-শহর-গ্রাম নির্বিশেষে এই চর্চা চলছে। এমন বিনিয়োগের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে দেশ। এইচএসসি পাসের পরে সাধারণ ঘরের মা-বাবাও দেখি ঢাকায় বাসা নেন বা মেসে রেখে সন্তানদের কোচিং করান। এক বছরে ভর্তি হতে না পারলে দুই বছর পর্যন্ত এই কোচিং চলে।যে শিশু-কিশোরকে স্কুলের পরেও চার-পাঁচজন শিক্ষকের কাছে পড়তে যেতে হয় রোজ, সে নিজে কখন পড়ে?

পাঠ্যবস্তুর সাথে তার নিজের পরিচয় কীভাবে হবে? আমি বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা বলে দেখেছি। তাঁরা যুক্তি মানেন, কিন্তু ঝুঁকি নিতে রাজী নন। তাঁদের অজুহাত, প্রাইভেটে না পড়লে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করেন। নম্বর দেন না। খারাপ ব্যবহার করেন। তাদের মনোবল ভেঙে যায়। আমার মনোবিজ্ঞানী ভাইয়ের কাছে শুনেছি, কথা না কি সত্য। অনেক শিশু-কিশোর সারা জীবনের ট্রমায় পড়ে যায়। অনেক কেস আসে প্রতিনিয়ত এই সমস্যা নিয়ে তাঁর কেন্দ্রে। কাজেই মা-বাবা হিসেবে সন্তানের নম্বর পাওয়া বিষয়ে কোন ঝুঁকি তাঁরা নিতে পারেন না। এই যুক্তিতে সন্তানের জন্য আবেগ এবং বাস্তব-বোধ দুই-ই আছে। কিন্তু যেটা নেই তা হল সন্তানকে নিজে শেখার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা। আমি এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কথাও জানি যাঁরা তাদের তৃতীয় শ্রেণির সন্তানকেও প্রাইভেটে পড়ান। ভিকারুননিসায় শুনেছি এসি এবং নন-এসি কোচিং ক্লাস চলে। এখন স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের দৌরাত্ম্যের কাছে বাবা-মা আত্মসমর্পণ করেছেন না কি তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে শিক্ষকরা ব্যবসা ফেঁদেছেন, সেই ডিম আগে না মুরগি আগে বিতর্কের নিষ্পত্তি আসলেই হওয়া দরকার। জাতীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে। ভিকারুননিসায় এখন লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়। এই লটারিতে খুব শিক্ষিত মা-বাবার সন্তানও অংশ নেন। মজার ব্যাপার হল, যাদের সন্তান ভর্তি হতে পারে, তাঁরা বলেন এটা ভালো পদ্ধতি; যাঁদের সন্তান ভর্তি হতে পারে না, তাঁরা বলেন খুব খারাপ পদ্ধতি এটি। এবং পরের বছরের লটারি ধরার জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন।

৩.

আমি আমার বন্ধুদের মায়েদের বলতে শুনেছি, ছোটবেলায় তাঁদের বাসায় গেলে, ‘ও-ও যা খায়, তুইও তাই খাস, তাহলে ও তোর চেয়ে বেশি নম্বর পায় ক্যামনে? না কি তোরে খাওয়াই না?’ একজন সন্তানের জন্য এবং একজন সহপাঠীর জন্য এ তুলনা যে কী মর্মান্তিক! আমি একবার আমার এক সহপাঠীর মাকে দেখেছি আমার সহপাঠীকে সারা রাস্তা মারতে মারতে নিয়ে যেতে। কারণ আর কিছুই না, আমার সেই সহপাঠী ‘জানা প্রশ্নের’ উত্তর ভুল লিখেছে পরীক্ষায়। মুশকিল হল, আমাদের অভিভাবকরা এ বিষয়ে সচেতন পর্যন্ত নন। পাবনা জিলা স্কুলের এক ছেলে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন, প্রথম দেখায় আমাকে বলেছিলেন, তোমাকে আমি ঘৃণা করে বড় হয়েছি। আমার আব্বা সব সময় তোমার সাথে আমার তুলনা করতেন। ওর বাবা আর আমার বাবা একই অফিসে চাকরি করতেন।

আছেন আত্মীয় নামের উপকারী বন্ধুরা। যাঁরা জীবনে একবারের জন্যও বাড়িতে আসেননি, কিংবা দশ বছরেও খোঁজ নেননি- বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলেই তাঁদের উৎসাহের প্লাবন বয়ে যায় খোঁজ নেবার। এই কান্ড আরো বেশি ঘটে যখন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয়। আত্মীয়-স্বজন-পরিচিতদের তখন যেনো মহোৎসব বসে। ‘ওহ! তোমার মেয়ে চান্স পায় নাই? তমুকের ছেলে তো মেডিক্যালে পাইছে।’ আত্মীয়ের পুত্র-কন্যা গোল্ডেন জিপিএ পাওয়ার পরে যে বুকে একটু ব্যথা ব্যথা লেগেছিলো, সেটা কেটে আলো ঝলমলে দিন আসে যেনো তাদের জীবনে তখন। মা-বাবার অপমানের বোঝা এইসব অকৃতকার্য সন্তানদের ওপরে ন্যস্ত হয়।

তাই শৈশব থেকেই মা-বাবা মরিয়া ছেলেমেয়ের সাফল্যে নিজেদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে। তাঁদের সন্তান সেই চাপ কীভাবে মেটাচ্ছে সে চিন্তা বাহুল্য। প্রয়োজনে নকল করে, নিজেরা নকল সরবরাহ করে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনে হলেও ছেলেমেয়ের ভালো রেজাল্ট, ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া নিশ্চিত করতে চান তাঁরা। এই চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ‘প্রশ্নফাঁস বাণিজ্য’ টিকে আছে। চাহিদা না থাকলে এটি বাণিজ্য হয়ে উঠতে পারতো না। তাঁদেরও বা কী দোষ! এক নম্বরে পিছিয়ে থাকলে ভর্তি পরীক্ষায় কয়েকশো জনের পেছনে পড়ে যাবে। যার মানে সারা জীবনের মতো সাফল্যের দৌঁড়ে পিছিয়ে থাকা। কাজেই সন্তানদের শৈশব শেষ করে, জীবন শুষে নিয়ে, প্রয়োজনে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কিনে, কিংবা নকল সরবরাহ করে হলেও মা-বাবা সন্তানকে সামাজিকভাবে ‘সফল’ দেখতে চান। এই চাওয়ার মধ্যে তাঁরা দোষ দেখেন না। এছাড়াও পারিবারিক- সামাজিক ইজ্জতের সওয়াল তো আছেই।

৪.

ঘরের কথা বলি। আমার বাবা নিজে আমাদের পড়াতেন। কোন ভাই-বোন পরীক্ষায় একটা অঙ্ক ভুল করে এলে বাবা অস্থির হয়ে যেতেন। নিজে খাটের বাজুতে মাথা ঠুকতেন। দেশের বাড়িতে হাল চাষ করতে পাঠানোর হুমকি দিতেন। আমরা পরীক্ষা ভালো দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করতাম বাবার ভয়ে। আমার এক দাদা ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় সম্ভবত একটা অংক ভুল করেছিলেন। আমরা তখন রাঙ্গামাটিতে থাকি। বাসায় ঢোকার সাহস তার হয়নি। সন্ধ্যায় ঘরের বাইরের সিঁড়িতে চুপ করে বসেছিলো। তাকে সেখানে আবিষ্কারের পরে সেই রাতে তার ওপর দিয়ে আমার বাবা যে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, সে অবিশ্বাস্য। আমরা ছোটরা ভয়ে কুঁকড়ে ছিলাম। পরদিন বাকি পরীক্ষা ছিলো, কিন্তু সেই তা-বের পরে কারো পক্ষেই হয়তো সে’রাতে পড়া সম্ভব হত না। পরদিন সকালে পরীক্ষা দিতে যাবার আগেও বাবা বলেছেন ও পরীক্ষা দিতে যায় কেনো? ওকে তো আমি ফুলবাড়ি (আমাদের গ্রামের নাম) পাঠাবো হাল চাষ করতে। সেই দাদা সেই বৃত্তি পরীক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জিলায় প্রথম হয়েছিলেন। এরপর বাবা এক গাল হেসে বলেছিলেন, আমি তো জানতাম। তিনি কী করেছিলেন তা ততোদিনে বেমালুম ভুলেছেন।

আমি সেইরাত মনে করে আজও বলি, অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারতো সেই রাতে। ঘটেনি, সেটা সৌভাগ্য। আমার বাবা কি লোভী ছিলেন? বিষয়-সম্পত্তির লোভ তাঁর ছিলো না। কিন্তু, সন্তান-গর্বে গর্বিত হবার লোভ ছিলো তাঁর মারাত্মক। তাঁর কোন সন্তান নকল করে ধরা পড়লে হয়তো তিনি বাঁচতেই পারতেন না। সেই চাপ নিয়েই আমরা বড় হয়েছি। মেনে নিয়েছি। সেটা ছিলো নৈতিকতার সাথেমেধার স্ফূরণের জন্য নৈতিক অভিভাবকের চাপ। আজকের অনেক অরিত্রী সেই চাপ নিতে পারবে না, হয়তো বাঁচতেই চাইবে না। অরিত্রীর ঘটনায় একটি অংশ আমরা কিন্তু জানি না। স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলা শেষে বাসায় ফেরার পথে এবং ফিরে আসার পরে সে কোন ধরণের ব্যবহার পেয়েছিলো পরিবারে।

দিন বদলেছে। অভিভাবকদেরও নতুন করে শেখার দিন এসেছে। (চলবে)

লেখক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.