অরিত্রীপাঠ-তিন: শিক্ষাব্যবস্থা এবং নকল

কাবেরী গায়েন

 

আমি কি নকল করাকে সমর্থন করছি?

শুরুতেই বলে নেয়া ভালো, ভিকারুননিসা নূন স্কুল কর্তৃপক্ষের যে রুঢ় আচরণের জন্য অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে মর্মে খবর পাওয়া গেছে, প্রথম কিস্তিতে সেই রুঢ়তার বিপরীতে অবস্থান নেবার জন্য যাঁরা প্রশ্ন করেছেন, আমি নকলকে সমর্থন করছি কি না, তাঁদের প্রতি আমার পরিষ্কার উত্তর, ‘না’। আমি নকল করাকে সমর্থন করিনি।

প্রথমত, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জানিয়েছে অরিত্রীর মোবাইলে পাওয়া বিষয়বস্তুর সাথে তার পরীক্ষার খাতায় লেখা বিষয়ের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাজেই, অরিত্রী নকল করেছে মর্মে যে খবর চাউর করা হয়েছিলো, সে খবর মিথ্যা। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সাপেক্ষে বলা যায়, অরিত্রী যেহেতু নকল করেই নি, তাই নকল করাকে সমর্থন করার প্রশ্নটি-ই এক্ষেত্রে অবান্তর। অরিত্রী ও তার পরিবারের প্রতি যে রুঢ় আচরণ করা হয়েছে, সেই আচরণের বিরুদ্ধাচরণ করা মানে নকলকে সমর্থন করা নয়। সেই সাথে বলে রাখছি যে, এমনকি যদি মিল পাওয়াও যেতো পরীক্ষার খাতা আর মোবাইলের বিষয়বস্তুর, তবুও আমি অরিত্রীর বাবার প্রতি এই রুঢ় আচরণের প্রতিবাদ বহাল রাখতাম। প্রকৃতপক্ষে, আমি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বের হবার আগেই, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী অরিত্রী নকল করেছে ধরে নিয়েই তার অভিভাবকদের সাথে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ করেছি। সে অবস্থান থেকে সরে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।

আমি বরং বলতে চাই, পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকেছে দেখার পরে সেই মোবাইল জব্দ করা পর্যন্তই দস্তুর। এমনটা আমাদের বিভাগের পরীক্ষার হলেও হামেশাই ঘটে, এবং আমরা ঠিক এতোটুকুই করি। তবে, যদি ভিকারুননিসা নূন স্কুলে লিখিত নিয়ম থেকে থাকে যে কেউ মোবাইল নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকলেই তাকে টিসি দেয়া হবে, তাহলে কিছু বলার নেই। সেটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ব্যাপার। আমার পছন্দ-অপছন্দে কিছু যায় আসে না। যাঁরা এসব স্কুলে তাঁদের সন্তানদের ভর্তি করান, ধরে নেই এসব জেনেই ভর্তি করান।

সেই শৈশব থেকে শুনে এসেছি ক্যাডেট কলেজের নিয়মানুবর্তিতার কথা। যেসব অভিভাবক কাডেট কলেজে তাঁদের সন্তানকে ভর্তি করান, নিয়মানুবর্তিতার এসব মিথ জেনেই ভর্তি করান। অনেকে হয়তো এইসব শৃংখলার কথা জেনেই বরং বিশেষভাবে আগ্রহী হন সন্তানদের ভর্তি করতে। তো এসব অতি সম্মানের স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে যে বিশাল চাপ, সেই চাপ থেকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের জন্য কিছু উদ্যোগ স্কুলকে নিতে হতেও পারে। যেমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভুল উত্তর দেবার জন্য নম্বর কাটা হয়। এটা খুব পছন্দনীয় বিষয় নয়, কিন্তু একটা সিটের বিপরীতে যখন চার-পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী, তখন কোনো না কোনো উপায় নিতেই হয় চাপ কমানোর জন্য।

নকল করে ধরা পড়লে টিসির বিধান যদি থাকে সেটা দেয়ায় অভিভাবকদের রাগ করার কিছু নেই, কেননা তাঁরা এই বিধানের কথা জানেন। দশ লক্ষ টাকা দিয়ে এসব স্কুলে সিট কেনেন, বা পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চাকে লটারি তুলতে নিয়ে স্কুলের দরোজায় হাজির হন যেসব বাবা-মা, তাঁরা স্কুলের নিয়মের কথা জানেন না, বিশ্বাস করতে আমার অসুবিধা আছে। কিন্তু, সে’জন্য শিক্ষার্থীর মা-বাবার সাথে খারাপ আচরণ করাটা বৈধ হয়ে যায় না। তাই নিন্দা আমি জারি রাখছি।

দ্বিতীয়ত, আমি নকলকে সমর্থন করছি না বলাই যথেষ্ট নয়। আমি বরং সকল প্রকার নকলের বিরুদ্ধে। আসলে নকলের সংজ্ঞা এবং ব্যাপ্তি নিয়েই বরং আলোচনা হোক।

দুই।

নকল কি কেবল পরীক্ষার হলে নিয়ে যাওয়া কাগজের টুকরো? বই? কিংবা মোবাইল ফোনে ডাউনলোড করা কোন ছবি বা জামার আস্তিনে লিখে আনা প্রশ্নের উত্তর যা দেখে দেখে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় লেখে চুরি করে? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের গোটা শিক্ষাপাড়ায় শুধু এতটুকুই নকল বলে স্বীকৃত। পরীক্ষার হলে বসে এই কাজ করাকেই কেবল অন্যায় মনে করা হয়। কিন্তু পরীক্ষার হলে ঢোকার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যে প্রশ্নের উত্তরগুলো মুখস্ত করল কোন পরীক্ষার্থী যা নিজে সে প্রস্তুত করেনি, যে প্রশ্নের উত্তর লিখেছেন কোন প্রাইভেট শিক্ষক বা কোচিং সেন্টারের কোচ, অন্যের লেখাসেই নোট মুখস্ত করে খাতায় উগরে দিয়ে আসাকে আমরা কতজন নকল মনে করি? আদৌ কেউ করি কি? আমার সন্দেহ আছে। অথচ পার্থক্য তো কেবল অন্যের লেখা নোট পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে এবং পরে ব্যবহারের। সারা বছরের নকল করে আয়ত্ত করা শিক্ষাকে, যা বিপুল উদ্দীপনায় স্কুল, প্রাইভেট শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজ-পরিজন প্রবলভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন, তকমা দেয়া হচ্ছে নকলের কেবল যদি কাগজের টুকরোটাকে কয়েক মিনিট পরে পরীক্ষার হলে উদ্ধার করা হয়। কী হাস্যকর আমাদের বিচার পদ্ধতি! ব্যতিক্রম পাই রবীন্দ্রনাথে, যিনি লিখেছেন, ‘মুখস্ত করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি! যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই-বা কম কী করিল?’ (শিক্ষা। শিক্ষার বাহন)

রবীন্দ্রনাথের এই কথা সোনার জলে বাঁধিয়ে রাখার মতো। তবে, তিনি যেটুকু বলেননি এখানে তা হল, শিক্ষার্থীকে মগজের মধ্যে মুখস্ত বিদ্যারূপী চৌর্যবৃত্তিকে ঢুকানোর আপাদমস্তক পদ্ধতিকে কী নামে ডাকা হবে। আমি বলি গোটা পদ্ধতিই হচ্ছে নকল পদ্ধতি। এখানে খালি পরীক্ষার হলে উদ্ধার করা কাগজের টুকরোটিকে নকল বলে চালানোর মানে হয় না। আমি এই গোটা প্রাইভেট আর কোচিং নির্ভর মুখস্তবিদ্যা পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে আসার পদ্ধতিকেই নকল বলছি। সেই নকলের বাইরে আজ আর কেউ নেই- না শিক্ষক, না অভিভাবক, না শিক্ষার্থী।

এমন প্রশ্নপত্র কেনো হবে যে কোন শিক্ষার্থী কী প্রশ্ন আসতে পারে অনুমান করে শিক্ষক বা অন্য কারো তৈরি করা নোটের মুখস্ত উত্তর মাথায় নিয়ে পরীক্ষার হলে আসতে পারে? আমাদের সময়ে চল ছিলো ‘সাজেশন’-এর। অমুক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে হবে, উনি খুব ভালো সাজেশন দেন। দশটা সাজেশন দিলে আটটাই কমন আসে। সেই শিক্ষক কীভাবে জানতেন কোন প্রশ্ন আসবে? জানতেন, কারণ প্রশ্ন কমন পড়ারও একটা মুখস্ত ধারা ছিলো। যেমন, কোন অধ্যায় থেকে ‘ক’ প্রশ্ন গতবারে এসে গেছে, অতএব এবারে ওটি আর আসবে না, অন্য যে প্রশ্নটি হতে পারে সেটি আসবে। অতএব, ধন্বন্তরি প্রাইভেট শিক্ষকের তেলেসমাতি মেনে দশ অধ্যায়ের বই থেকে গতবারে না আসা অন্য যে দশটি প্রশ্ন আছে, সেই দশটি পড়ার, মুখস্ত করার এবং সুচারুভাবে উগরে দিয়ে আসার নামই ছিলো ভালো ছাত্রত্ব। এই অবস্থার পরিবর্তন তো হয়ই নি, বরং প্রশ্নব্যাংক জাতীয় মুখস্ত পরীক্ষণের মধ্য দিয়ে পড়াশুনাটা একটা মস্ত প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শুনতে পাই, বর্তমান বিভীষিকার নাম না কি সৃজনশীল প্রশ্ন। মজার ব্যাপার হল, সেই সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য না কি প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার কোন বিকল্প নেই। সৃজনশীলতার অসাধারণ প্রয়োগই বটে!

তিন।

যারা এই মুখস্তবিদ্যায় একটু কম পারদর্শী তাদের বিড়ম্বনার শেষ নেই। আমি পরীক্ষার হলে অংকের সূত্র মনে রাখতে পারতাম না, অংকের উত্তর মনে রাখার চেষ্টাও করিনি কখনো। তাই পরীক্ষার হলেই যখন আমার বন্ধুরা বলতেন অংকের উত্তর মিলেছে, তখন অবাক হতাম। আর কলেজে স্ট্যাটিক্স, ডিনামিক্স করার সময়ে অংকের সূত্র মনে থাকতো না বলে আমার চারিপাশের মানুষের মতো নিজেও বিশ্বাস করতাম আমি অংকে ভালো না। বিদেশে পিএইচডি করতে যাবার পরে যখন ক্লাসে স্ট্যাটিস্টিক্স পড়াতে শুরু করলাম, তখন অনেকে বলতে শুরু করলেন আমি খুব ভালো বুঝি বিষয়টা। সত্যি বলতে আমার চোখে জল চলে এসেছিলো, যেদিন প্রথম বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার হলে পাহারা দিতে গিয়ে শুরুতেই পরীক্ষার্থীদের হাতে সব ফর্মুলা লেখা একটা একটা বড় কাগজ ধরিয়ে দিয়েছিলাম। হায়! শুধু এটুকু সুযোগ আমার দেশেও থাকলে আমার পড়াশুনা হয়তো অন্য ধারায় হতো। আমাদের দেশে অংক বোঝার সাথে ভালো শিক্ষার্থী হবার সম্পর্ক নেই, বরং সূত্র মুখস্ত রাখার সাথেই এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত।

চার।

আমি এই সামগ্রিক নকল পদ্ধতির ঘোর বিরোধী, পরীক্ষার হলে এক-আধ টুকরা কাগজ নিয়ে ধরা পড়ে যে শিক্ষার্থী কেবল তাকে ডাইনি হত্যা করে এই নকল পদ্ধতির উপশম করা সম্ভব না। শিক্ষা নীতি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষকের মান- এর সব কিছুতে আমূল সৃজনশীল পরিবর্তন না এনে ‘নকল’ করতে গিয়ে ধরা পড়া শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অপমান-লাঞ্ছনা-শাস্তির ছুরি বাগিয়ে তোলাটা এই গোটা অনৈতিক নকল ব্যবস্থার বলিকে ফের শাস্তি দেয়া ছাড়া আর কিছুই না। অনৈতিক ব্যবস্থায় যাঁরা বড় করছেন, তাঁরাই পেলেপুষে বড় করা শিকারটিকে মুহূর্তে ‘অনৈতিক’ তকমা লাগিয়ে ছুঁড়ে ফেলে নিজেদের পরিশুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এটা ঘোর অন্যায়। এই অবস্থার অবসান দরকার। শিক্ষা পদ্ধতির সৃজনশীল এবং মানবিক পরিবর্তন চাই। বিদ্যমান পরিস্থিতি বজায় রেখে একজন নিরপেক্ষ বিচারক কাকে শাস্তি দেবেন আসলে নকলকারী হিসেবে?

কেনো নকল করে শিক্ষার্থী? বরং আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, নকলের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থী ফের কেনো নকল করে? নকল করে, ভালো ফল করার আশায়, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও। এই আশাটা তাঁর নিজস্ব স্বপ্নপূরণের জন্য যতোটা তার চেয়ে অনেক বেশি মা-বাবার স্বপ্নপূরণের জন্য। মা-বাবার শাস্তি থেকে রেহাই পাবার জন্য। পরিবেশের চাপের জন্য। সমাজ রাষ্ট্রের চাহিদার সাথে নিজেকে যোগ্য প্রমাণের জন্য। স্বপ্নটি তাঁর নিজের হলে সে নিজেই পড়াশুনাটা মনযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করত, বা নিজের চেষ্টায় যতোটা পারে সেই অর্জনে সুখী থাকবার চেষ্টা করত। হয়তো পরীক্ষার পড়ার বাইরে আরো অনেক যে বিষয়ে তার ঝোঁক রয়েছে, সেই ঝোঁকের দিকে মনযোগী হতে পারত। তাহলে হয়তো কেবল বিসিএস পরীক্ষায় পাশ করার জন্য নিজেকে তৈরি না করেহয়ে উঠতে পারতো একজনলেখক, বাখেলোয়াড় বা শিল্পী। কার্ল মার্ক্স তাঁর সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় যেমনটা চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক এই সমাজ; শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই, ছেলেমেয়েদের চাকরির বাজারে যোগ্য হয়ে ওঠার জন্য কতগুলো বিশেষ বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেতে হয় তীব্র প্রতিযগিতার মধ্য দিয়ে। সে’জন্য মা-বাবারা বিপুল বিনিয়োগ করেন সন্তানদের উপর। সেইসব বিনিয়োগকৃত সন্তানদের সামাজিক মাপকাঠিতে অসফল হবার সুযোগ নেই। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তাঁর জন্য নানা রকমের শাস্তির বিধান করে রেখেছে। ফলে তাকে এই নকল ব্যবস্থার মধ্যেই সফল হতে হয়। কিন্তু অন্যের চিন্তা-কাজ বছরের পর বছর মুখস্ত করে উগরে দেয়া খুব সহজ কাজ নয়। সবাই পারে না। যে পারে না, শাস্তি তাঁর পিছু ছাড়ে না। মূলত দৃশ্য-অদৃশ্যমান শাস্তির ভয়েই সে নকল করে। গোটা প্রক্রিয়ার সাথে শেখার সম্পর্ক কমই। পুরো বিষয়টিই বরং শাস্তি ও ভয়ের।

মা-বাবা অন্যের সন্তানের সাথে তাদের সন্তান পিছিয়ে পড়বে বা তাদের নিজেদের জীবনের মতো সন্তানের জীবনও যথেষ্ট সফল হবে না যদি না প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে, এই ভয় থেকে নকল করার সকল উপায় ও উপকরণের মধ্য দিয়ে সন্তানকে চালিত করতে পিছপা হন না। নকল করে ধরা পড়লে তাঁরা লজ্জিত হন, কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতে ফেসবুকে কিংবা অন্য যে কোন মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রখুঁজতে থাকেন। মেডিক্যালে ভর্তি করার জন্য পরীক্ষার আগের রাতে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে কোচিং সেন্টারের অজানা ঠিকানায় সারারাত সন্তানকে রাখতে পিছপা হন না। তাই সন্তানের কামিয়াব না হবার কোনো অপশন নেই। নকলের মধ্যে বেড়ে ওঠা মরিয়া মা-বাবার মরিয়া সন্তান তাই পরীক্ষার হলে নকল করে।

অসহায় মা-বাবাই বা কী করবেন? প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে কেবল তাদের সন্তানই পিছিয়ে থেকে ধুঁকতে থাকবে, তারাই বা সেটা মেনে নেবেন কীভাবে- যদি সন্তানের পেছনে বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকে? এখানেই আসে সিস্টেমের প্রসঙ্গ। আমরা যে সিস্টেমে বসবাস করছি, সেই সিস্টেমের মূল উপজীব্য লোভ ও ভয়। ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’- অর্থাৎ পড়াশুনার সাথে সম্পর্ক দেখানো হয় গাড়িঘোড়া চড়ার, বিত্তবৈভবের। চিত্তের কোন ব্যাপার নেই। এই ধারাটি সেই মদনমোহন তর্কালংকার থেকে শুরু করে আজকের বিসিএস-ভিত্তিক পড়াশুনার মূল দার্শনিক ভিত্তি। সাথে আছে শৈশবের ক্ল্যাসিক টোনাটুনির গল্প, কৈশোরের পাটিগণিতে দুধের মধ্যে জল মেশানোর গল্প, এবং বর্ণমালা পরিচয়ের সময়েই শ্রেণিবৈষম্য সমাজে জিইয়ে রাখা শুধু নয়, স্বাভাবিক দেখানোর সকল তৎপরতা- ‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে’ থেকে ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশিপ, হ্যাভ ইউ অ্যানি উল, ইয়েস স্যার ইয়েস স্যার থ্রি ব্যাগস ফুল’। একটা সোনার হরিণ চাকরিই এই শিক্ষা ইন্ডাস্ট্রির মূল উপজীব্য। গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় না আছে নৈতিকতা, না আছে সৃজনশীলতা। উপরন্তু, স্কুলে ভর্তি হবারও আগে যে শিশুকে কোচিং কিংবা গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠিয়ে তাদের করে দেয়া নোট মুখস্ত নামের আপাত নিরীহ কিন্তু আসলে অন্যের ভাবনাকে নকল করে ভালো রেজাল্ট করার সাতকাহন শেখানো হয় পরিবার, শিক্ষায়তন এবং সমাজ থেকে, সেই শিশুই টুকরো কাগজ সমেত ধরা পড়ামাত্র এই সব প্রতিষ্ঠান থেকে যে নিগ্রহের শিকার হয়, সেই শাস্তি-অপমান-নিগ্রহই তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। সেই আমার শৈশব থেকে দেখে এসেছি, বড় বড় স্কুলের ভালো রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীদের গর্বিতমুখ খবরের ডামাডোলের নিচে পরীক্ষায় অকৃতকার্যশিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর। আমার কাছে সব আত্মহত্যাই আসলে হত্যাকাণ্ড, এবং সকল হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক। মানুষ সবচেয়ে ভালোবাসে নিজেকে, সেই মানুষের আশা করার, বেঁচে থাকার ন্যূনতম পথটি বন্ধ করে হত্যার নাম হল আত্মহত্যা।

আমার শান্ত বন্ধু তামিমের মৃত্যু হয়েছিলো পরীক্ষার হলে নকল নামের টুকরো কাগজ ধরা পড়ার দায়ে। এগুলো তো শারীরিক মৃত্যু, আমরা দেখতে পাই। যা আমরা দেখতে পাই না, তা হল মানসিক মৃত্যু- বিশাল, বিপুল মৃত্যু। যে অকৃতকার্য হল, তার শারীরিক মৃত্যু যদি নাও হয়, সামাজিক মৃত্যু ঘটে যায়। এ তো গেল একদিক।

সবচেয়ে মারাত্মক যে ক্ষতিটি ঘটে, সেটি হল কোচিং নির্ভর-গৃহশিক্ষক নির্ভর- মুখস্তবিদ্যা নির্ভর-নকলনবিশ শিক্ষাব্যবস্থায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর নিজের পড়াটা নিজে করতে পারার, কিংবা নিজের চিন্তা করার যে জন্মগত ক্ষমতা- তার মৃত্যু। এই ফাঁদটা আমরা দেখি না, দেখতে চাই না। আমরা সবাই মিলে সেই ফাঁদ পেলে-পুষে অতিকায় দানব বানিয়ে সেখানে পাঠিয়ে দিচ্ছি আমাদের সন্তানদের। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সামগ্রিক চিন্তাকাঠামো বড় বড় মৃত্যুফাঁদ।

লেখক: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.