অন্ধকার গলির মানুষদের গল্প আমরা কিভাবে পড়তে পারি

আ. রিয়াজ  

ইতিহাসের দুই দৃষ্টিভঙ্গি- মার্কসীয় ও পুুঁজিবাদী ব্যাখ্যা। মার্কসীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘‘মানুষের ইতিহাস শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস’’। পুঁজিবাদী ব্যাখ্যায় শ্রেণি বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলা হয়, ‘‘পরস্পর অবাধ প্রতিযোগিতায় মানব ইতিহাস রচিত হয়’’।

যেখানে রাষ্ট্র সবার মধ্যে প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ তৈরি করে। জীববিজ্ঞানে বিবর্তনবাদের যে ব্যাখ্যা সেখানে ‘শ্রেণি এবং অবাধ প্রতিযোগিতা’ দুটিকে অস্বীকার করা হয়। সেখানে বলা হয়, যোগ্যরা টিকে থাকে শ্রেণিনিরপেক্ষভাবে। তবে এটি সামাজিক ব্যাখ্যা ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সামাজিক ইতিহাসে বিবর্তনবাদের ব্যাখ্যা প্রযোজ্য না হলেও একটি সামান্য যোগসূত্র রয়েছে সব ইতিহাস পরম্পরায়। আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা সকল ঘটনায় একই সূতার টান দেখা যায়। সু-উচ্চ ভবনের কাঁচ থেকে ঠিকরে পড়া নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব দুনিয়া ব্যাপি সকল মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এই চোখ ধাঁধানো প্রতিবিম্ব কয়েক দশক আগেও ছিল না। চীনে প্রথম যখন বারুদ আবিষ্কার হয় সেটি বন্দুকের নলের মধ্যে ঢুকতে প্রায় পাঁচশ বছর লেগেছিল। অর্থ্যৎ খ্রিস্ট বর্ষের প্রথম সহ¯্রাব্দের শেষদিকে বারুদ আবিষ্কার হয়। আর গত সহ¯্রাব্দের মধ্য সময় বন্দুক বা কামানের গোলা হিসেবে বারুদ ব্যবহার শুরু হয়। গত কয়েক দশকে দেখা গেছে এই পরিবর্তন হতে সময় লাগে মাত্র কয়েক বছর। ১৯০৩ সালে বিমান মানুষ (যাত্রী) নিয়ে প্রথম আকাশে উড়লেও সেটি নিয়ে চাঁদে যেতে সময় লেগেছে মাত্র ৬৬ বছর। মহাশূন্যে যেতে সময় লেগেছে আরও কম। ১৯০৩ সালে হয়ত কেউ ধারণাই করেনি, ১৯৬৯ সালে এই বিমান প্রযুক্তি দিয়ে চাঁদে পৌঁছাতে পারবে মানুষ। এখন প্রযুক্তি পরিবর্তন হতে সময় নেয় আরও কম। কয়েক মাসের মধ্যেও আমরা পরিবর্তন দেখতে পাই। এতসব পরিবর্তনের মধ্যে এগিয়ে চলা মানুষের ইতিহাস যা লেখা হয় সেখানে শুধুমাত্র লেখা হয় যোগ্যদের ইতিহাস। পুঁজিবাদের সমান প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়া মানুষেরা ইতিহাসের কোথাও থাকে না।

গত শতকের পৃথিবীর যে ইতিহাস লেখা হয়, তার বেশিরভাগ অংশজুড়ে রয়েছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস। সুনির্দিষ্ট করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস। এই ইতিহাসে মানুষের ইতিহাস খুব বেশি পাওয়া যায় না। যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষকে যেতে হয়েছে তাতে অধিকাংশের কথা এই ইতিহাসে নেই। গায়ে উর্দি পড়া সেনাসদস্যদের কথা কোথাও খোদাই করে লেখা থাকলেও ১৯৪৩ সালে বাঙলার দুর্ভিক্ষে যে হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা গেছে তাদের কথা কোথাও লেখা নেই। শুধুমাত্র কয়েকটি সম্ভাব্য সংখ্যা দিয়ে এই মানুষের হিসেব রাখা হয়েছে। ওই সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যারা জানতো না, কেন যুদ্ধ হচ্ছে? এতে কার লাভ কিংবা ক্ষতি? এই সব না জানা মানুষেরা বাস্তুচ্যুত হয়েছে নিজের জমি থেকে ঘর থেকে। তাদের কথা কোথাও কোন তথ্যে লিপিবদ্ধ করেনি কেউ।

ইতিহাসের অন্ধ গলিতে থাকা মানুষেরা এখনো আছে। তাদের কথা মাঝে মাঝে কেউ সাহিত্যে নিয়ে আসে। তেমনই দুটি চরিত্র মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কুবের কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গফুর। এই দুই চরিত্র বাংলা সাহিত্যে একটি বড় প্রভাব থাকলেও আমাদের সামাজিক জীবনের গল্পে তাদের কোন পরিবর্তন আমরা দেখিনি। তাদের পরিবর্তন কিংবা ইতিহাসের মহাসড়কে তাদের উপস্থিতি কমছে নাকি বাড়ছে? রাষ্ট্র প্রতিদিন হিসেব করে আমাদের সামনে তুলে ধরছে তাদের উপস্থিতি খুব দ্রুত এলইডি টেলিভিশনের পর্দার মত উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মাথাপিছু আয়ের হিসেবটি সকল সমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যোগ্যদের খুব পছন্দ। বারবার হিসেবটি মানুষের সামনে তুলে ধরে। কিন্তু গল্পটি কি? কিভাবে বয়ে চলছে মানুষের ইতিহাস? অন্ধকার গলি থেকে তারা কি বের হতে পারছে আলোকিত সড়কে, যাদের কথা কোথাও লিপিবদ্ধ হয় না।

শ্রেণিসংগ্রাম বা অবাধ প্রতিযোগিতা যাদের জীবনে কোনো প্রভাব রাখে না, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম যাদেরকে চালিত করে তাদের গল্প আমাদের সামনে কতটুকু আছে? এমনি একটি গল্পের চরিত্র চট্টগ্রামের মিনু আক্তার। কোন সাহিত্যিক তার গল্পে এই চরিত্র সৃষ্টি করেনি। আমাদের চোখের সামনে সৃষ্টি হয়েছে এই চরিত্রের। ত্রিশ বছর বয়সের মিনু আক্তারের চেহারায় কোন চাকচিক্য বা চোখ ধাঁধানো আকর্ষণ ছিল না। কুবেরের স্ত্রী মালার মত তার স্বামীও তাকে ফেলে চলে গিয়েছিল তিন সন্তানসহ। তিন সন্তানের ভরণপোষণ করতে মিনু আক্তার কখনো মানুষের বাসায় কাজ করতেন, কখনো রাস্তায় ভিক্ষা করতেন। তিন সন্তানের একজন মো. গোলাপ। সে মাদ্রাসায় পড়ে। মা ভিক্ষা করে এই সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রাণপন চেষ্টা করতো। তার আরেক ছেলে ইয়াসিন স্কুলে পড়তো। এই সময় মিনুকে কেউ একজন সন্তানদের মানুষ করতে পারবে এমন একটি সুন্দর প্রস্তাব দেয়। খুনের অভিযোগে কুলসুমা বেগম নামে কোন এক মহিলার পরিবর্তে যাবজ্জীবন সাজা খাটতে জেলে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সন্তানদের কথা তার মাথায় নিশ্চয়ই কাজ করতো। প্রতিমাসে টাকা পাওয়ার চুক্তিতে মিনু জেলে যায়। জেলে যাওয়ার কয়েকমাস আগে তার শেষ সন্তান জান্নাতের জন্ম হয়। এই সন্তানকে জেলের বাইরে অন্য কারো কাছে দিয়ে দেওয়া হয়। তার সন্তানদের প্রতিমাসে টাকা দেওয়ার কথা। সেই টাকায় চলবে সন্তানদের ভরণপোষণ। তিন বছর পর বিষয়টি নজরে আসে কর্তৃপক্ষের। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় মিনু নামের যে নারী জেল খাটছেন তিনি কোন আসামী নন। তাকে মুক্তি দেওয়া হয় ২০২১ সালের ১৬ জুন। জেল থেকে বের হয়ে মিনু জানতে পারে তার সর্বশেষ সন্তানটি অনেক আগেই মারা গেছে। মিনুকে কেউ কখনো জেলে দেখতেও যায়নি। তাই সে জানতে পারেনি তার সন্তানেরা কিভাবে আছে। বের হয়ে আরও জানতে পারে, তার সন্তানেরা কেউ কোন টাকা পায়নি। একটি ছেলে স্কুল ছেড়ে দিয়ে দোকানে কাজ করে। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে মিনু। যার সঙ্গে এত বড় একটি অন্যায় হলো রাষ্ট্র তার কোন খবরই রাখল না। কয়েকদিনের ব্যবধানে ২০২১ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামের কোন সড়কে একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় এক নারী মারা যান। অজ্ঞাত হিসেবে পুলিশ তাকে দাফন করে দেয়। আরও কয়েকদিন পর জানা গেল সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া নারীটি মিনু। কেউ খবর রাখেনি- চোখ ধাঁধানো বিজলি বাতি কিভাবে দেখতো মিনু? মিনু জানতো না অবাধ প্রতিযোগিতা কিংবা শ্রেণিসংগ্রাম কিভাবে ইতিহাস নির্ধারণ করে। মানব ইতিহাসে মিনুর গল্প কোথাও লেখা থাকবে না।

এমন মিনুর গল্প আমাদের চারিপাশে আরো কত আছে। নাকি অজ্ঞাত দুর্ঘটনার মত এমন ঘটনা খুব বেশি নেই। মিনু সম্ভবত সমাজের বিপরীতে যায়নি তার বেঁচে থাকা অধিকার নিয়ে। যারা বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে অন্ধকার গলি থেকে বের হয়ে তারই মত কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের গল্প কতটুকু বিপরীত। আমাদের জানা নেই। প্রতিদিন আমাদের সামনে এমন বহু গল্প গণমাধ্যমের পাতায় ভেসে ওঠে। রনি নামের আরেকটি চরিত্র। তার স্ত্রী নাজমা বেগম ও একটি ৮ বছরের কন্যা সাদিয়াকে নিয়ে রাজধানীতে ভাড়া থাকতো। দেশের কোন এক অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসে বাসের সহকারী হিসেবে কাজ করতো রনি। একদিন সন্ধ্যায় স্ত্রীকে রাতে কাজের কথা বলে বের হয়ে যায় রনি। ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর সকালে রনির স্ত্রী নাজমা বেগমের ঘুম ভাঙ্গে পুলিশের ফোনে। নাজমা বেগমকে পুলিশ নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় যেতে বলে। সেখানে গিয়ে নাজমা বেগম ও তার শিশুকন্যা সাদিয়া যা দেখতে পায় তার জন্য তাদের কোন প্রস্তুতি ছিল না। তারা দেখেন আটটি লাশ। তার মধ্যে ছোট্ট শিশু সাদিয়ার বাবাও আছে। এই দেখেই নাজমা বেগম অজ্ঞান হয়ে যান। আগের দিন সন্ধ্যায় ঢাকার বাসা থেকে বের হয়ে আসা রনি আড়াইহাজার এসেছিল ডাকাতি করতে। চালের আড়তে ডাকাতি করতে গিয়ে এলাকার উন্মত্ত মানুষের রোষের শিকার হন। ১৫ থেকে ২০ জন ডাকাত দলের ৮ জনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। এলাকার মসজিদ থেকে ডাকাত হামলার কথা ছড়ানো হলে হাজার হাজার মানুষ বের হয়ে আসেন এবং এই নৃশংষ ঘটনার সূত্রপাত। রনির সঙ্গী আরও সাত জনের বাড়িতেও এমন ভাবে কষ্ট পেয়েছে তাদের সন্তানেরা বা তাদের বাবা-মায়েরা। তারাও কষ্ট পায় কেউ তাদের বাড়িতে ডাকাতি করতে এলে। এদের কেউ কখনো অবাধ সমান প্রতিযোগিতার সামনে পড়েনি। তারা প্রতিযোগিতা করেছে নিজের জীবনের সঙ্গে।

মিনুর সন্তান গোলাপ বা রনির কন্যা সাদিয়া দুনিয়াকে কিভাবে দেখেন? তারা বড় হয়ে যে গল্প পড়বে সেখানে ডাকাতদের ঘৃণা করবে নাকি সেই সব উন্মত্ত মানুষকে অবিবেচক ভেবে নেবে। রাষ্ট্র কখনো কি উন্নয়নের গল্পে সাদিয়ার বেঁচে থাকার গল্প বলেছে? মিনুর দুই সন্তান কোথায় থাকে, তারা কি লেখাপড়ার সমান প্রতিযোগিতায় টিকে আছে? আমরা কেউ জানি না। আমাদের সামনে শুধুমাত্র এই মিনু কিংবা রনির গল্প নয়। রাষ্ট্রীয় প্রবৃদ্ধির ডামাডোলে অসংখ্য মানুষ তালিকাচ্যুত হয়ে আছে। সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের সূক্ষ্ম জালের সূতা তাদের আটকাতে পারেনি। বৃহৎ রাজনৈতিক আলাপের গল্পেও এসব অন্ধকার গলির তালিকাচ্যুত মানুষদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। শতাব্দির নতুন ইতিহাসে কারা স্থান পাবে সেটা নির্ধারিত হয়ে আছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বর্ষবরণের আলোকের দ্যুতি যে পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় তার বাইরের অন্ধকার নিয়ে আমরা এই শতাব্দিতেও সম্ভবত কিছু জানতে পারবো না। পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়া গল্পের বাইরে যে হাজার হাজার গল্প আছে সেগুলো কিভাবে আমরা পড়তে পারি? যতক্ষণ পর্যন্ত এইসব গল্প কোথাও লিপিবদ্ধ না হবে, কেউ পড়তে না পারবে, ততক্ষণ শুধু ইতিহাসের খণ্ডিত অংশই আমাদের পড়তে হবে।

লেখক: সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.